সৌদি-পাকিস্তান চুক্তিতে কি করবে ভারত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৮ বার
সৌদি-পাকিস্তান চুক্তিতে কি করবে ভারত

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক যে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা একে ‘ইসলামী ন্যাটোর’ প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে দেখছেন এবং এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ‘বিপদ সংকেত’ হিসেবে মূল্যায়ন করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামাবাদ ও রিয়াদের এই সমঝোতাকে ব্যর্থ নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র নীতির প্রতিফলন হিসেবেও ধরা যেতে পারে।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মধ্যপ্রাচ্য ও আরব দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তার নিয়মিত সফরকে লক্ষ্য করেও এই সামরিক সমঝোতা রোধ করা সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, এটি ভারতের গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার প্রকাশ। সৌদি ও পাকিস্তান যখন গোপনে চুক্তির নীলনকশা প্রণয়ন করছিল, নয়াদিল্লি সেই তথ্য জানত না। ফলে এই বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়নি এবং শুধুমাত্র বিবৃতির মাধ্যমে নজর রাখার পরামর্শ দিতে হয়েছে।

সেনা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি ভারতের জন্য সামরিক দিক থেকে বিপজ্জনক। পাকিস্তানের মাটিতে কোনো অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে ভারতকে দ্বিগুণ সতর্ক হতে হবে, কারণ চুক্তি অনুযায়ী সৌদি আরব পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের জটিলতা আরও বৃদ্ধি করবে। এছাড়া ভারত যদি পূর্বে চালানো অপারেশন সিঁদুরের মতো অভিযান পুনরায় চালানোর চিন্তা করে, তাহলে দু’দেশের সঙ্গে একযোগে মোকাবিলা করতে হবে।

ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে ইতিমধ্যেই নানা উত্তেজনার সূত্র বিদ্যমান। সিন্ধু চুক্তি স্থগিত করার পর পাকিস্তান পারমাণবিক হামলার হুমকি দিয়েছে। গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলেও সীমান্ত বিবাদ রয়েছে। ২০১৮ সালে পাকিস্তান আচমকাই নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে স্যার ক্রিক ও জুনাগড়কে তাদের অংশ দাবি করেছে এবং সীমান্তের আশেপাশে সামরিক পরিকাঠামো বৃদ্ধি করেছে। এসব পরিস্থিতি ভারতকে আরও সতর্ক করেছে।

গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, সামরিক শক্তির নিরিখে পাকিস্তান ১২তম, সৌদি আরব ২৪তম এবং ভারত চতুর্থ স্থানে রয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা খাতে পাকিস্তান হাজার কোটি ডলার ব্যয় বরাদ্দ করেছে। সৌদি ও পাকিস্তান যথাক্রমে ৭ হাজার এবং ৮ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ব্যয় করে থাকে। এর ফলে ভারতকে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য আরও সতর্ক থাকতে হবে।

সৌদি বিমানবাহিনীতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এফ-১৫’ এবং ইউরোপের যৌথ উদ্যোগে তৈরি ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ রয়েছে। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে সৌদি এই জেটগুলো পাকিস্তানকে সরবরাহ করতে পারে। তাছাড়া, সৌদি থেকে ভারতের তেলের আমদানি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ভারত তার খনিজ তেলের ৮৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল সংঘাত চলাকালে ইউরোপে তেল সরবরাহ বন্ধ হলে মারাত্মক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হয়েছিল।

পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সমঝোতায় পাকিস্তান ক্রমাগত অন্যান্য দেশকেও যুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ৫৭টি মুসলিম দেশ সামরিক চুক্তিতে যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থান আরও সংকীর্ণ হবে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, পাকিস্তান এসব চুক্তির মাধ্যমে আরব দেশ থেকে বড় অর্থ সংগ্রহ করতে চায় এবং তা সেনাশক্তি বৃদ্ধি করতে ব্যয় করবে।

প্রবাসী ভারতীয়দের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। সৌদি আরব ও আরব উপসাগরীয় দেশে প্রায় ৯০ লাখ ভারতীয় কর্মরত রয়েছেন। সামরিক চুক্তি যদি কার্যকর হয়, তাহলে প্রবাসী ভারতীয়দের বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি ভারতের জন্য হুমকিস্বরূপ।

কিন্তু ভারতের জন্য অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ন্যাটো-ধাঁচের চুক্তি করা কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি করলে আরব-ইহুদি সংঘর্ষে অংশ নিতে হবে, আর রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি মানে ইউক্রেনে যুদ্ধে সামরিক পাঠানো। তাই মোদি সরকার ‘ধীরে চলো’ নীতিতে আটকে আছে।

যদিও সৌদি ও ভারত মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক শক্তিশালী। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে পণ্য লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ১৮৮ কোটি ডলার। বিপরীতে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদির বাণিজ্য মাত্র ৩০০–৪০০ কোটি ডলার। তাই বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাকিস্তান সৌদি থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে না।

পশ্চিমা গণমাধ্যমের মতে, এই ধরনের সামরিক সমঝোতার পেছনে আরব দেশগুলোর নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। তারা পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তানকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চাইছে। এতে ওই অঞ্চলের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যেতে পারে।

চূড়ান্তভাবে, ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি ও পাকিস্তান চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী, যদি কোনো দেশ আক্রান্ত হয়, তা উভয়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে ‘ইসলামী ন্যাটো’ গড়ে তুলতে পারে এবং এই অঞ্চলে ভারতের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বেড়ে যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত