প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় হিমাচল প্রদেশে পাহাড়ি ধসের ভয়াবহতায় আবারও প্রাণ গেল নিরীহ মানুষের। বিলাসপুর জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রবল বৃষ্টিপাতের মধ্যে চলন্ত একটি যাত্রীবাহী বাস পাহাড় থেকে ধসে পড়া বিশাল পাথর ও মাটির স্তূপে চাপা পড়ে কমপক্ষে ১৮ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় আরও তিনজনকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ভারতের গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া সূত্রে জানা যায়, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা পুরো রাজ্যজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এনেছে। উদ্ধারকর্মীরা রাতভর অভিযান চালিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন। হিমাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিং সুখু ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযানের তদারকি করছেন এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিকেলে হরিয়ানার রোহতক থেকে বিলাসপুরের ঘুমারউইন যাচ্ছিল যাত্রীবাহী একটি বাস। বাসটিতে ৩০ থেকে ৩৫ জন যাত্রী ছিলেন। হঠাৎ প্রবল বর্ষণের কারণে পাহাড়ি রাস্তার এক অংশ ভেঙে পড়ে বাসের ওপর। পাহাড় থেকে ধসে আসা বিশাল পাথর, কাদামাটি ও গাছের চাপায় মুহূর্তেই থেমে যায় যানটির গতি। স্থানীয় বাসিন্দারা তড়িঘড়ি করে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন, কিন্তু ধসের ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় পুলিশ, দমকল বাহিনী ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল (এনডিআরএফ) ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। উদ্ধারকর্মীদের একজন জানান, পাথরের ওজন এতই বেশি ছিল যে হাতে করে সরানো সম্ভব হয়নি। এক্সকাভেটর ও ক্রেন ব্যবহার করে ধসে পড়া স্তূপের ওপর থেকে পাথর সরাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। পরে বাসের ছাদ কেটে জীবিত তিনজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তবে তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
রাতভর চলে উদ্ধার অভিযান। দুর্ঘটনাস্থল পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল ছিল, ফলে উদ্ধারকর্মীদের সেখানে পৌঁছাতেই সময় লেগে যায়। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, “আমরা খবর পাওয়ার পরপরই দল পাঠিয়েছি। কিন্তু পাহাড়ি রাস্তা বৃষ্টিতে পিচ্ছিল হয়ে পড়েছিল। উদ্ধারযানগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা লেগেছে।”
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অবিরাম বর্ষণের কারণে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে গিয়েছিল। ফলে সামান্য কম্পনেই বিশাল অংশ ভেঙে পড়ে। দুর্ঘটনার সময় বাসটি রাস্তার মোড়ে ছিল, যা উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তোলে।
হিমাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিং সুখু টুইটারে লিখেছেন, “বিলাসপুরের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে আমি গভীরভাবে শোকাহত। নিহতদের পরিবারকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হবে।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য ২ লাখ রুপি এবং আহতদের ৫০ হাজার রুপি করে অনুদান দেওয়া হবে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে।
মোদির ভাষায়, “এই দুর্ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন তাদের জন্য আমার হৃদয় শোকাভিভূত। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা অরুণ ভান্ডারি বলেন, “বিকেল থেকে বৃষ্টি থামছিল না। হঠাৎ আমরা একটি ভয়াবহ শব্দ শুনি—মনে হচ্ছিল পুরো পাহাড় নড়ছে। মুহূর্তের মধ্যেই বাসটি মাটির নিচে হারিয়ে যায়। আমরা দৌড়ে গিয়ে দেখি, বাসের একটি অংশ দৃশ্যমান, বাকি অংশ কাদার নিচে। তখনও কয়েকজন যাত্রী চিৎকার করছিলেন।”
একজন উদ্ধারকর্মী বলেন, “বাসের ভেতর থেকে সাহায্যের আর্তনাদ শুনে হৃদয় ভার হয়ে যায়। কিন্তু পাথর সরাতে অনেক সময় লেগেছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, তবুও কিছু মানুষকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।”
হিমাচল প্রদেশ ভারতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলের একটি। প্রায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই সেখানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপ্রতুল অবকাঠামো, অতিরিক্ত রাস্তা নির্মাণ এবং পাহাড় কেটে বাড়িঘর তৈরির কারণে ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
গবেষক ড. রাজীব রাও বলেন, “হিমাচলে গত দশ বছরে ভূমিধসের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরণও পরিবর্তিত হয়েছে—একটানা কম বৃষ্টি না হয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। এতে পাহাড়ের মাটি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে স্থানীয় প্রশাসনের সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট। পাহাড়ি অঞ্চলে যান চলাচলের আগে আবহাওয়া সতর্কতা মেনে চলা উচিত ছিল।”
বিলাসপুর জেলা হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা চলছে। সেখানে ভিড় জমিয়েছে নিহতদের স্বজনেরা। অনেকেই এখনও নিখোঁজ প্রিয়জনের খবরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। হাসপাতালে এক মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেটা সকালে ফোনে বলেছিল ঘুমারউইনে পৌঁছালে জানাবে। এরপর শুধু খবর এল, বাস চাপা পড়েছে। আমি এখন কীভাবে বাঁচব?”
স্থানীয় প্রশাসন নিহতদের মরদেহ শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ কিছু মরদেহ এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে সরাসরি শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
গত এক মাস ধরে হিমাচল প্রদেশে টানা বর্ষণ ও পাহাড় ধসে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অনেক জায়গায় সড়ক ও সেতু ধসে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। রাজ্য সরকার ইতোমধ্যে একাধিক জেলায় রেড অ্যালার্ট জারি করেছে এবং নাগরিকদের অপ্রয়োজনে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, “আমরা সম্ভাব্য বিপদের অঞ্চলগুলোতে নজর রাখছি। যেসব এলাকায় মাটির গঠন দুর্বল, সেখানে অতিরিক্ত যান চলাচল বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষণার পাশাপাশি রাজ্য প্রশাসনও নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। বিলাসপুর জেলা প্রশাসন মৃতদের পরিবারের জন্য ৫ লাখ রুপি এবং আহতদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার ঘোষণা দিয়েছে।
এছাড়া স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও রেড ক্রস সোসাইটির সদস্যরা ঘটনাস্থলে সহায়তা করছে। এলাকাবাসী ও প্রশাসন যৌথভাবে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ অব্যাহত রেখেছে।
এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসের ঝুঁকি এবং প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের অসহায়ত্ব। প্রযুক্তি, অবকাঠামো বা উন্নয়নের অজুহাতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করলে তার প্রতিফলন ভয়াবহ হতে বাধ্য—হিমাচলের এই মর্মান্তিক ঘটনা সেই বাস্তবতারই নির্মম প্রতিচ্ছবি।
নিহতদের শোকে স্তব্ধ পুরো বিলাসপুর ও হিমাচল প্রদেশ। পাহাড়ের নিচে থেমে গেছে এক জীবনের যাত্রা, রেখে গেছে অগণিত কান্না, বেদনা আর এক অবর্ণনীয় শূন্যতা। কিন্তু এই শোকের মধ্যেও প্রশ্ন থেকে যায়—আর কত মৃত্যু লাগবে প্রকৃতি ও মানবিক সতর্কতার মধ্যে ভারসাম্য আনতে?