রসায়নে নোবেল তিন বিজ্ঞানীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৯৬ বার
রসায়নে নোবেল তিন বিজ্ঞানীর

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা।  একটি বাংলাদেশ ডেস্ক 

২০২৫ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে তিনজন বিজ্ঞানীর নামে — সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রোবসন এবং ওমার এম. ইয়াগি। সুইডিশ একাডেমি তাদেরকে সম্মানিত করেছে কারণ তারা মেটাল অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক (এমওএফ) নামে এমন একধরনের আণবিক নির্মাণশৈলী উদ্ভাবন ও বিকশিত করেছেন, যা বিশাল অভ্যন্তরীণ পোরাসিটি বা গহ্বরযুক্ত কাঠামো হিসেবে কাজ করে এবং অনন্য পরিমাণে গ্যাস ও রসায়নিক পদার্থ ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয় — এই ঘোষণা রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের বিশ্বকে নতুনভাবে আলোড়িত করেছে।

মেটাল অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক বলতে বোঝায় যে ধরনের স্ফটিকভিত্তিক পদার্থ যেখানে ধাতব আয়ন বা ধাতব ক্লাস্টারগুলো ‘নোড’ হিসেবে কাজ করে এবং সেগুলোকে জুড়ে দেয় দীর্ঘ জৈব লিঙ্কার termed as organic linkers। ফলশ্রুতিতে একটি ত্রিমাত্রিক নেটওয়ার্ক গঠিত হয়, যার ভেতরে বড় বড় ছিদ্র বা গহ্বর থাকে। এই গহ্বরগুলোর আয়তন, রসায়নীক পরিবেশ এবং সিলেক্টিভিটি — সবকিছুই রসায়নবিদরা নিয়ন্ত্রিতভাবে ডিজাইন করতে পারেন; ফলে এমওএফকে বলা হয় ‘নকশাবদ্ধ’ পোরাস পদার্থ। অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ন বৈশিষ্ট্য হলে তা হলো এমওএফ-র উপকরণ খুবই হালকা হলেও অভ্যন্তরে বিশাল বিন্যাসে গ্যাস ধারণ করতে পারে — অর্থাৎ ওজনের তুলনায় বিপুল ধারণক্ষমতা।

তিন বিজয়ীর অবদান পারস্পরিকভাবে আলাদা হলেও পরস্পর পরিপূরক। রিচার্ড রোবসন früh কাজগুলোতে ধাতব-কেন্দ্রিক জৈব-আধারিত নেটওয়ার্কের সম্ভাবনা প্রদর্শন করেননি বরং তাত্ত্বিক ও কন্সেপ্টুয়াল ভিত্তি কেমন হবে তা প্রতিষ্ঠা করেন। সুসুমু কিতাগাওয়া এমওএফগুলোর গঠন, তাপ-স্থিতিশীলতা ও গ্যাস শোষণের ক্ষেত্রে মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ পরীক্ষা করে এবং নতুন ধরনের কাঠামো তৈরির পথ দেখান। ওমার ইয়াগি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষেত্রের নেতৃত্বে রয়েছেন, এমওএফ ধারণার শিল্পায়ন, বিভিন্ন প্রয়োগের জন্য উপযুক্ত কাঠামো ডিজাইন এবং এদের বড় স্কেলে ব্যবহারযোগ্য করার দিকগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আনেন। সংক্ষেপে বলা যায়, তিনজনের কাজই একসাথে এমওএফকে কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতুক নয়, বরং বাস্তব জগতে ব্যবহার্য একটি প্রযুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এমওএফের ব্যবহারজগত বহুবিধ। শুষ্ক মরুভূমির বাতাস থেকেই জল সংগ্রহ, কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে কেবলনির্গমন হ্রাস, আলো ও তাপ সংবেদিত পরিবেশে বিষাক্ত গ্যাস আবদ্ধ রাখা, এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়া ত্বরান্বিত করা—এসব কাজের জন্য এমওএফ সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে কার্বন ক্যাপচার ও স্টোরেজে এমওএফের কার্যকারিতা আশাব্যঞ্জক; কারণ উদ্ভাবিত কাঠামোতে বড় পরিমাণে CO₂ নিরাপদে আটকে রাখা যায় এবং প্রয়োজনীয় সময় পুনরায় মুক্ত করে প্রক্রিয়াগত ব্যবহার করা সম্ভব। জ্বালানি কোষ ও বিদ্যুৎ সঞ্চয় ডিভাইসে এমওএফ-কেন্দ্রিক উপকরণ উন্নয়নের কাজও চলমান রয়েছে। এমনকি বিশুদ্ধ গ্যাস সরবরাহ বা গ্যাস বিভাজনের শিল্পেও এমওএফ উৎপাদন খরচ কার্যকর হলে বিপ্লব ঘটাতে পারে।

বিজ্ঞানের ঘরানায় এমওএফকে বলা হচ্ছে ‘ন্যানো-আর্কিটেকচার’ বা ‘আণবিক ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর একটি মৌলিক ধারা। এখানে প্রতিটি উপাদান—ধাতু এবং জৈব লিঙ্কার—নির্বাচিত হয় নির্দিষ্ট রসায়নিক ও শারীরিক গুণের জন্য। লিংকার বদলালে কাঠামোর গহ্বরের আকার আর রসায়নিক পরিবেশ বদলে যায়; ফলত নির্দিষ্ট গ্যাস বা আণবিকের জন্য সিলেক্টিভিটি অর্জন করা যায়। এমওএফের এই নকশাগত নমনীয়তা এটিকে বিশেষভাবে মূল্যবান করে তোলে।

নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর বৈশ্বিক রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান ক্ষেত্রের একাংশে দ্রুত সাড়া পড়েছে। গবেষক ও শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমওএফের নীতিগত ধারণা ডানদিকে অগ্রসর হলে পরিবেশগত সংকট ও শক্তি চাহিদা মোকাবিলা করার নতুন উপায় খুলে যাবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, যদিও ল্যাব পর্যায়ে ফল এবং পারফরম্যান্স চমকপ্রদ, বড় পরিসরে উত্পাদন, স্থায়িত্ব, খরচ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো চ্যালেঞ্জ এখনও রয়েছে। এমওএফ-ভিত্তিক যন্ত্রপাতি শিল্পায়িত করতে হলে এসব সমস্যার টেকসই সমাধান দরকার।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে পানি নিরাপত্তা, পরিবেশগত দূষণ ও দূর্গম এলাকায় পরিষেবাপ্রাপ্তি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে এমওএফভিত্তিক প্রণালী বাস্তবায়িত হলে তা প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বাতাস থেকে জল উত্তোলন বা ন্যূনতম দক্ষতায় কার্বন ধারণ পদ্ধতি যদি সাশ্রয়ী হয়, তা স্থানীয় ও জাতীয় পরিকল্পনায় যুক্ত করা যেতে পারে। তবে তা করতে হলে গবেষণা–উদ্যোগ, সরকারি নীতি সহায়তা এবং বেসরকারি শিল্পের বিনিয়োগ সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করতে হবে—নইলে শুধু বৈজ্ঞানিক অর্জন থেকেই সমাজিক সুবিধা নিশ্চিত হবে না।

রসায়নে নোবেল অর্জন প্রতিটি যুগেই বিজ্ঞানের প্রগতির একটি হিসেবে দেখা হয়; ২০২৫ সালের এই স্বীকৃতিও তাই—এটি দেখায় কিভাবে মৌলিক বৈজ্ঞানিক ধারানাগুলো একটি কার্যকর প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রোবসন ও ওমার এম. ইয়াগির কাজের ফলে আমরা এখন এমন এক দিক উন্মোচনা করলাম যেখানে কণার আকারের স্থাপত্য নিয়ন্ত্রণ করে বৃহৎ পরিসরের পরিবেশগত ও শিল্পগত সমস্যার সমাধান খোঁজা সম্ভব। ভবিষ্যৎ গবেষণা ও শিল্পায়ন এ ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করবে—এটাই নোবেল কমিটির প্রত্যাশা এবং বিশ্ববিজ্ঞানের কাছে এই বছরের এক গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত