প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই এ বছর ঘোষণা হতে যাচ্ছে নোবেল শান্তি পুরস্কার। নরওয়ের রাজধানী অসলোতে স্থানীয় সময় শুক্রবার বেলা ১১টায় (০৯০০ জিএমটি) বিজয়ীর নাম ঘোষণা করবে নোবেল কমিটি। কিন্তু ঘোষণার আগেই একটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ পুরস্কার পাচ্ছেন না, যদিও তিনি একাধিকবার নিজেকে এ পুরস্কারের যোগ্য দাবিদার বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
বর্তমান বিশ্বের ভঙ্গুর শান্তি পরিস্থিতি বিবেচনায় নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে সারা বিশ্বেই চলছে জোর জল্পনা। সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৪৬ সালে বৈশ্বিক সংঘাত নিয়ে যে তথ্যভান্ডার তৈরি করেছিল, তার পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৪ সালে পৃথিবীতে যত সশস্ত্র সংঘাত ছিল, তার পরিমাণ ইতিহাসে নজিরবিহীন। এক বা একাধিক রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন সংঘাতের সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা সংস্থার ভূমিকা ও বার্তা এ বছর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে, তিনি অন্তত আটটি আন্তর্জাতিক সংঘাতের সমাধান করেছেন এবং সে কারণেই তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য। তবে বিশেষজ্ঞরা তাঁর এই আত্মপ্রচারকে অতিরঞ্জিত বলেই মনে করছেন। সুইডেনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার ভ্যালেনস্টিন বলেন, “না, এ বছর ট্রাম্প নোবেল পাচ্ছেন না। তবে হয়তো পরের বছর? তখন তাঁর কিছু উদ্যোগের ফলাফল স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।” তিনি মনে করেন, বিশেষ করে গাজা সংকট নিয়ে ট্রাম্পের ভূমিকা এখনও মূল্যায়নের অপেক্ষায় আছে।
অসলো পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান নিনা গ্রেগার বলেন, “গাজায় শান্তি আনার প্রচেষ্টার বাইরেও আমরা ট্রাম্পের এমন অনেক নীতি দেখেছি, যা নোবেলের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আলফ্রেড নোবেল তাঁর উইলে যে নীতিগুলো উল্লেখ করেছিলেন—আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জাতির ভ্রাতৃত্ব ও নিরস্ত্রীকরণ—সেগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের খুব কমই মিল পাওয়া যায়।”
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বশান্তির ধারণার পরিপন্থী। তাঁর প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুপাক্ষিক চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেন। এমনকি মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ উভয়ের সঙ্গেই তিনি বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন। ট্রাম্প এক পর্যায়ে ডেনমার্ক থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়েছিলেন, যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। এছাড়া মার্কিন শহরগুলোতে অভ্যন্তরীণ আন্দোলন দমনে সেনাবাহিনী পাঠানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করাসহ নানা কর্মকাণ্ড তাঁকে বিতর্কিত করে তোলে।
নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানকারী কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াতনে ফ্রিডনেস এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা কোনো ব্যক্তিকে বিচার করি তাঁর সামগ্রিক ভূমিকা দেখে। শান্তির জন্য তিনি বাস্তবে কী অর্জন করেছেন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” তাঁর মতে, ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা জনপ্রিয়তা নয়, বরং তাঁর কার্যকর অবদানই নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নোবেল কমিটি এমন কাউকে বেছে নিতে পারে, যিনি যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, মানবাধিকার রক্ষা কিংবা জলবায়ু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এ বছরের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধানে কাজ করা কূটনীতিকরা, গাজা ও পশ্চিম তীরের মানবাধিকারকর্মীরা, আফ্রিকার সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নারী শান্তিরক্ষীদের নেতৃত্বদানকারী কর্মী এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যুবনেতারা।
প্রতিবছরের মতো এবারও নোবেল শান্তি পুরস্কারকে ঘিরে বিশ্বের নানা প্রান্তে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ, রাজনৈতিক বিভাজন ও মানবিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত এক বিশ্বে শান্তির বার্তা ছড়ানোর এই পুরস্কার বরাবরের মতোই আশার প্রতীক। তবে কার হাতে উঠবে সেই প্রতীকী পুরস্কার—সেটি জানতে অপেক্ষা করতে হবে ঘোষণার দিন পর্যন্ত।
যদিও ট্রাম্পের নাম এখন আলোচনার বাইরে, তাঁর দাবি ও প্রচারণা এই পুরস্কারের রাজনীতিক গুরুত্বকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার কেবল একজন ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্মান নয়, এটি মানবতার প্রতি প্রতিশ্রুতির প্রতীক। আর তাই ২০২৫ সালের এই পুরস্কারও বিশ্ববাসীর কাছে শান্তি, সহানুভূতি ও সহযোগিতার এক নতুন বার্তা বয়ে আনবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন শান্তিকামী মানুষরা।