শান্তিতে নোবেল জিতেছিলেন যে চার মার্কিন প্রেসিডেন্ট

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৯২ বার
শান্তিতে নোবেল জিতেছিলেন যে চার মার্কিন প্রেসিডেন্ট

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক / একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে আলোচিত ২০২৫ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার এ বছর পেয়েছেন ভেনিজুয়েলার বিরোধী রাজনীতিক ও মানবাধিকারকর্মী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। কিন্তু পুরস্কার ঘোষণার আগে থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজেকে শান্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, এই পুরস্কারের যোগ্য তিনিই। এমনকি হোয়াইট হাউস থেকেও ট্রাম্পকে শান্তির নায়ক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল। তবু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়।

তবে এটি নতুন কিছু নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে নোবেল পুরস্কারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ইতিহাসে একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ট্রাম্প যদিও এখনো সেই তালিকায় নাম তুলতে পারেননি, তবু তাঁর আগে চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের নোবেল জয় কেবল ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতে একেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে আছে।

প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান, তিনি ছিলেন থিওডোর রুজভেল্ট। ১৯০৬ সালে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে তিনি যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন, তা বিশ্ববাসী গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। পোর্টসমাউথ চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি ঘটানোয় রুজভেল্টকে নোবেল কমিটি শান্তির দূত হিসেবে বিবেচনা করে। আজও ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইংয়ের রুজভেল্ট রুমে তাঁর সেই নোবেল মেডেলটি ঝুলে আছে, যা আমেরিকান কূটনীতির ইতিহাসে এক গর্বিত প্রতীক।

রুজভেল্টের পর যুক্তরাষ্ট্রের আরেক প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ১৯১৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বিশ্ব যখন নতুন করে শান্তির স্বপ্ন দেখছে, তখন উইলসন সেই সময়ের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক শান্তি উদ্যোগ হিসেবে ‘লিগ অব নেশন্স’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। তাঁর ১৪ দফা পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিজেই শেষ পর্যন্ত সেই সংগঠনে যোগ দেয়নি, তবু বিশ্বশান্তির ধারণা প্রতিষ্ঠায় উইলসনের অবদান ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। নোবেল কমিটি তাঁর প্রস্তাবিত ন্যায়ের ভিত্তিতে স্থায়ী শান্তির প্রয়াসকেই স্বীকৃতি দিয়েছিল।

দীর্ঘ বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯তম প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ২০০২ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। বিশেষ বিষয় হলো, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় নয়, বরং দায়িত্ব ছাড়ার ২১ বছর পর এই স্বীকৃতি পান। ক্ষমতায় থাকার সময় মধ্যপ্রাচ্যে মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যে ‘ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি’র মধ্যস্থতা করে বিশ্ব রাজনীতিতে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে তিনি মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য বিমোচনে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ‘দ্য কার্টার সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করে তিনি আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শান্তি ও নির্বাচনী স্বচ্ছতার জন্য কাজ করেছেন। তাঁর নোবেল জয় ছিল একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের মানবিক প্রভাবের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।

চতুর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান বারাক ওবামা। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায়, ২০০৯ সালে, তিনি এই পুরস্কার পান। নোবেল কমিটি ওবামার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে নতুনভাবে প্রাণবন্ত করার প্রচেষ্টাকে পুরস্কারের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে। যদিও অনেকেই বলেছিলেন, ওবামার নোবেল পাওয়া ছিল ‘অকাল’ সিদ্ধান্ত, তবু তাঁর ‘হোপ অ্যান্ড চেঞ্জ’ বার্তা বিশ্বজুড়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপে তাঁর কূটনৈতিক সফরগুলো ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

এই চার প্রেসিডেন্টের নোবেল জয় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। তারা কেবল দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিনিধি ছিলেন না, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতে মার্কিন নৈতিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়েছেন। থিওডোর রুজভেল্টের শান্তিচুক্তি থেকে উইলসনের আন্তর্জাতিক সংহতি, কার্টারের মানবিক উদ্যোগ থেকে ওবামার বৈশ্বিক সহযোগিতা—প্রত্যেকের অবদান একেকটি ভিন্ন সময়ে বিশ্ববাসীর কাছে আশা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালে এসে শান্তিতে নোবেল নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। নিজের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্স্থাপনের চুক্তি, আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপ—এসব উদ্যোগের কারণেই তিনি নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দাবি করেন। হোয়াইট হাউস তাঁর সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালায়, এমনকি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক পোস্টে ট্রাম্পের একটি ছবির নিচে লেখা হয়, “দ্য প্রেসিডেন্ট অব পিস”—অর্থাৎ ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত নোবেল কমিটি অন্য সিদ্ধান্ত নেয়। ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে ২০২৫ সালের শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে আন্দোলন করে আসছেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাঁকে অভিনন্দন জানালেও পরে মন্তব্য করেন, “আমার মনে হয়, তাঁর এই পুরস্কারের পেছনে আমারও কিছু ভূমিকা আছে।”

ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, নোবেল শান্তি পুরস্কার কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রতিফলন। প্রতিটি পুরস্কারের পেছনে লুকিয়ে থাকে বৈশ্বিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক কৌশল ও আন্তর্জাতিক বার্তা। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁদের নোবেল জয় দিয়ে ইতিহাসে অমর হয়েছেন, আবার কেউ হয়তো থেকে গেছেন বিতর্কের কেন্দ্রে।

২০২৫ সালের এই বিতর্কে ফিরে আসে সেই পুরনো প্রশ্ন—নোবেল পুরস্কার কি প্রকৃত শান্তির স্বীকৃতি, নাকি এটি বৈশ্বিক রাজনীতির একটি প্রতীকী পদক্ষেপ? এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে ইতিহাস সাক্ষী, যে চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নোবেল জিতেছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই লক্ষ্য ছিল এক—যুদ্ধের পৃথিবীতে শান্তির ছোট্ট একটুখানি আলো ছড়িয়ে দেওয়া।

আজও তাঁদের নাম উচ্চারণ করলে সেই আলো যেন জ্বলে ওঠে—রুজভেল্টের কূটনৈতিক দক্ষতায়, উইলসনের ন্যায়নিষ্ঠতায়, কার্টারের মানবিকতায়, আর ওবামার আশাবাদে। তারা সকলেই প্রমাণ করেছেন, শান্তির রাজনীতি কেবল ক্ষমতার খেলা নয়; এটি মানবতার এক শাশ্বত প্রয়াস।
এমন এক প্রয়াস, যা হয়তো আজও বিশ্ব খুঁজে ফিরছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত