বিদেশি বিনিয়োগ সত্ত্বেও কেন থেমে গেল সিলেটের ঝুলন্ত সেতু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৭ বার
বিদেশি বিনিয়োগ সত্ত্বেও কেন থেমে গেল সিলেটের ঝুলন্ত সেতু

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ অনলাইন ডেস্ক

সিলেটের মানুষের বহু প্রতীক্ষিত ‘স্বপ্নের সেতু’ প্রকল্প অবশেষে বাতিল হয়ে গেছে। সুরমা নদীর ওপর কিনব্রিজের পাশে পরিকল্পিত ঝুলন্ত সেতুটি শহরের সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন জাগিয়েছিল। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও অজুহাতের জালে জড়িয়ে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) বলছে, ঝুলন্ত সেতুর পরিবর্তে পুরোনো কিনব্রিজের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনায় এগুচ্ছে তারা।

এই বাতিল হওয়া প্রকল্পের পেছনে রয়েছে এক আকর্ষণীয় কিন্তু হতাশাজনক কাহিনি—যেখানে বিদেশি বিনিয়োগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক অনীহা একত্রে সেতুর স্বপ্নটিকে থামিয়ে দিয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব ও আকর্ষণীয় পরিকল্পনা

২০২৪ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) বাংলাদেশে পাঁচটি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করে। প্রতিটি প্রকল্পে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার করে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় ব্যাংকটি। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সিলেটের সুরমা নদীর ওপর একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ প্রকল্প। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল নগরীর যানবাহনচাপ কমানো, পর্যটন আকর্ষণ বৃদ্ধি এবং পুরোনো কিনব্রিজের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা।

সওজ তখন ‘প্রি ডিটেলড প্রজেক্ট প্রফর্মা (পিডিপিপি)’ তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর সহায়তায় বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পে এনডিবি দিচ্ছিল ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ, আর বাকি অর্থ যোগান দিত বাংলাদেশ সরকার। টোল পদ্ধতির মাধ্যমে সেতু থেকে রাজস্ব আদায় করে ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রকল্পটির অগ্রগতি সম্পূর্ণভাবে থেমে যায়। প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তনের অজুহাতে নতুন সরকার এই প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রকল্প বাতিলের অজুহাত: বাস্তবতা নাকি আমলাতান্ত্রিক অনীহা?

সওজ সূত্র বলছে, ঝুলন্ত সেতু নির্মাণে দীর্ঘ এপ্রোচ সড়ক প্রয়োজন হওয়ায় পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। এই কারণেই প্রকল্পটি বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ‘প্রযুক্তিগত অজুহাত’। প্রকল্পটির জন্য প্রাথমিকভাবে যে স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটি কিনব্রিজের কাছাকাছি হওয়ায় বাস্তবায়নযোগ্য ছিল। প্রয়োজন ছিল কেবল আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন।

একজন প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রকল্প বাতিলের আসল কারণ জায়গা নয়; বরং প্রশাসনিক আগ্রহের অভাব। বিদেশি অর্থায়নের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নতুন নীতিগত জটিলতা ও অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের কারণে এটি বাদ দেওয়া হয়েছে।”

সওজের নতুন পরিকল্পনা: পুরোনো ব্রিজেই ‘নতুন জীবন’

প্রকল্প বাতিলের পর এখন সওজ কিনব্রিজের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত এই ঐতিহাসিক লোহার সেতুটি সিলেটের গর্ব, তবে বছরের পর বছর ভারী যানবাহনের চাপ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। নতুন পরিকল্পনায় সওজ ব্রিজের ভারবহন ক্ষমতা বাড়ানো, কাঠামোগত মেরামত ও নান্দনিক সংস্কারের কাজ হাতে নিতে চায়। তবে এই পরিকল্পনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং অর্থায়ন অনুমোদনের অপেক্ষায়।

স্থানীয়দের হতাশা ও পর্যটন খাতের ক্ষতি

প্রকল্পটি বাতিল হওয়ার খবরে হতাশা প্রকাশ করেছেন সিলেটবাসী ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব সিলেট (টোয়াস)-এর সাধারণ সম্পাদক শেখ রাফি বলেন, “সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কিনব্রিজের পাশে একটি ঝুলন্ত সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। এটি নির্মিত হলে সিলেটের নগর-সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়ত। লোহার তৈরি কিনব্রিজের পাশে ঝুলন্ত সেতুর দৃশ্য দেখতে অসংখ্য পর্যটক সিলেট আসতেন। প্রকল্পটি বাতিল হওয়া সত্যিই দুঃখজনক।”

পর্যটন বিশ্লেষকরা মনে করেন, ঝুলন্ত সেতুটি নির্মিত হলে এটি সিলেটের নতুন আইকনিক ল্যান্ডমার্কে পরিণত হতো, যা শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করতে পারত। এ ধরনের প্রকল্প বাতিল হওয়ায় সিলেটের অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনা আবারও থেমে গেল।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘হারানো সুযোগ’

অর্থনীতিবিদদের মতে, এনডিবির মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যখন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, তখন প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষত, যখন দেশীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে বৈদেশিক বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তখন এই সুযোগ হারানো একটি বড় ধাক্কা।

একজন সাবেক পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য বলেন, “সিলেটের ঝুলন্ত সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি হতে পারত অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিশীলতার প্রতীক। প্রশাসনিক জটিলতায় এমন প্রকল্প বাতিল হওয়া উন্নয়ন ধারাকে বাধাগ্রস্ত করে।”

সুরমা নদীর বুকে ঝুলন্ত সেতুর স্বপ্ন এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। এনডিবির বিনিয়োগ, সওজের পরিকল্পনা, স্থানীয় প্রত্যাশা—সবই মিলেমিশে একটি হারানো সুযোগের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু সিলেট নয়, গোটা দেশের জন্য একটি পর্যটন মাইলফলক হতে পারত। কিন্তু প্রশাসনিক অদক্ষতা, অস্থির রাজনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার অসঙ্গতিতে সেই স্বপ্নের সেতুটি আজ বাতিল ফাইলের নিচে চাপা পড়ে আছে।

সিলেটের মানুষ এখনো আশা করে—কোনো একদিন তাদের সেই ‘ঝুলন্ত সেতু’র স্বপ্ন আবার জেগে উঠবে, এবং একদিন হয়তো তারা সত্যিই দেখবে সেই সেতু সুরমার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত