গাজার আগামীর পথ কোন দিকে যাচ্ছে?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩১ বার
গাজার আগামীর পথ কোন দিকে যাচ্ছে?

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

দুই বছরের দীর্ঘ সংঘাত, রক্তক্ষয় আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ঘরে ফিরেছেন গাজায় বন্দি থাকা সব জীবিত ইসরাইলি জিম্মি। একই সঙ্গে ইসরাইলি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দি। এই ঐতিহাসিক বিনিময়কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প “অসাধারণ এক দিন” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক সম্ভাবনার সূচনা করতে পারে।

ইসরাইলের তেল আবিবের ‘হোস্টেজেস স্কয়ারে’ আজ এক আবেগঘন দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। মুক্তিপ্রাপ্ত ইসরাইলি বন্দিদের প্রত্যাবর্তন উদযাপন করতে সেখানে হাজারো মানুষ সমবেত হন। কারও হাতে ইসরাইলের পতাকা, কারও হাতে মার্কিন পতাকা, আবার অনেকেই প্রিয়জনের ছবিটি তুলে ধরেছেন চোখের জলে। চারপাশে উচ্ছ্বাস আর কান্না—দুই মিলিয়ে এক মানবিক আবহ।

অন্যদিকে, গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোও সমান আনন্দে ভাসছে। দীর্ঘ বন্দিজীবন শেষে ঘরে ফেরা প্রিয়জনদের ঘিরে কান্না আর উল্লাসের এক মিশ্র পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কেউ মসজিদে শুকরিয়া আদায় করছেন, কেউ আবার রাস্তায় এসে “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দিচ্ছেন।

এমন মানবিক আবেগের মধ্যেই মিশরের কায়রোতে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয় বহু প্রতীক্ষিত গাজা শান্তি চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, তুরস্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই চুক্তিকে অনেকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করছেন, তবে পরবর্তী পথচলা নিয়ে এখনো রয়েছে নানান প্রশ্ন ও সংশয়।

আল জাজিরার সাংবাদিক রোজিল্যান্ড জর্ডান বলেন, “ট্রাম্প শান্তি প্রক্রিয়াকে একটি সূচনা হিসেবে দেখছেন, কিন্তু ভবিষ্যৎ কী হবে সে বিষয়ে কোনো দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেননি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, গাজায় কে প্রশাসন চালাবে, কীভাবে নিরাপত্তা বজায় থাকবে, এবং পুনর্গঠনের নেতৃত্ব কে নেবে—এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।

বর্তমান ইসরাইলি সরকার, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং গাজার হামাস—এই তিন পক্ষের মধ্যে স্থায়ী শান্তির জন্য পারস্পরিক আস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। বহু বছর ধরে আলোচিত “দুই রাষ্ট্র সমাধান”—একটি ইসরাইল ও একটি ফিলিস্তিন—এখনো দূরের স্বপ্ন বলেই মনে করেন অনেকে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “এটি প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। বন্দিরা ঘরে ফিরেছেন, সেটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। এখন গাজার মানুষকে তাদের ঘরে ফিরিয়ে আনতে হবে, ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে পুনর্নির্মাণ শুরু করতে হবে।”

ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, গাজায় একটি আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক কাঠামো গঠিত হবে, যেখানে অভিজ্ঞ টেকনোক্র্যাটরা অস্থায়ীভাবে শাসনভার গ্রহণ করবেন। একই সঙ্গে গঠন করা হবে একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী, যারা গাজায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। ইসরাইলি সেনারা ধীরে ধীরে সীমান্তে ফিরে যাবে, যখন নিরাপত্তা বাহিনী পুরোপুরি কার্যকর হবে।

এ পরিকল্পনায় ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তি বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই বোর্ড শান্তি রক্ষা, পুনর্নির্মাণ এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের তদারকি করবে।

তবে সমালোচকরা বলছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু রাজনৈতিক চুক্তিতে সম্ভব নয়। সেখানে ঘরবাড়ি হারানো মানুষের বেঁচে থাকা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও খাদ্য নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, অর্ধেকেরও বেশি পরিবার এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, “গাজা এখন কেবল ধ্বংসস্তূপে ভরা এক ভূমি। সেখানকার মানুষ শান্তি চায়, নিরাপত্তা চায়। এই চুক্তি সেই পথে প্রথম আলোকরেখা।”

ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন হামাসকে নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। তাঁর মতে, হামাসকে কিছু সময়ের জন্য অস্ত্র রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে “শান্তি রক্ষা ও উপত্যকার নিরাপত্তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে।” এই বক্তব্যে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ এটিকে বাস্তববাদী অবস্থান হিসেবে দেখছেন, কেউ আবার বলছেন এটি হামাসের রাজনৈতিক অবস্থানকে বৈধতা দিচ্ছে।

নিজের শান্তি উদ্যোগ সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, “এটি আমার অষ্টম যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা। আমি নোবেল পুরস্কার চাই না, আমি চাই মানুষ বাঁচুক।”

তবে ইসরাইলের অভ্যন্তরে কিছু মহল এখনো সন্দিহান। তাঁদের আশঙ্কা, গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার মানেই নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ানো। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের দাবি—সত্যিকারের শান্তি কেবল তখনই সম্ভব, যখন গাজা ও পশ্চিম তীরের ওপর থেকে দখল সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হবে।

গাজা শান্তি চুক্তি তাই এখন একদিকে আশার প্রতীক, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার ছায়া। বন্দিদের ঘরে ফেরা এক মানবিক বিজয়, কিন্তু স্থায়ী শান্তির পথে পথচলা এখনও কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত