প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফুটবল ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক যোগ করল মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দল সৌদি আরব। জেদ্দার কিং আবদুল্লাহ স্পোর্টস সিটিতে মঙ্গলবার রাতে ইরাকের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে খেলার টিকিট নিশ্চিত করেছে দলটি। এর মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয়বার এবং মোট সপ্তমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ পেল সৌদি আরব।
সৌদি আরবের এই অর্জন শুধু একটি দেশের ক্রীড়া জগতে নয়, গোটা আরব বিশ্বে আনন্দের ঢেউ তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন উৎসবের আমেজ—“মাবরুক সৌদি” বা “Congratulations Saudi” বার্তা ভাসছে টুইটার ও এক্স-এ। দেশের রাজপরিবার থেকে শুরু করে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা গর্বভরে বলছেন, এটি সৌদি ফুটবলের ধারাবাহিক উন্নতির স্বীকৃতি।
এশিয়ার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের চতুর্থ রাউন্ডে ছয়টি দল দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। গ্রুপ ‘বি’-এর লড়াইয়ে সৌদি আরব এবং ইরাক শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয়। ম্যাচটি শেষ হয় ০–০ গোলে, যা সৌদি আরবের জন্য ছিল ইতিহাস রচনার মুহূর্ত। কারণ, এই এক পয়েন্টই তাদের সরাসরি বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে দেয়। ইরাকের জন্য এটি ছিল হতাশার রাত, কারণ ড্রয়ের ফলে তাদের পয়েন্ট সমান হলেও গোল ব্যবধানের কারণে বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা পায়নি তারা।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই ছিল সতর্ক। মাঠে ছন্দ খুঁজে নিতে সময় নেয় উভয়পক্ষ। ইরাকের সালেহ আবু আল-শামাত ১৩তম মিনিটে এক দুর্দান্ত প্রচেষ্টায় সৌদি রক্ষণভাগে হুমকি তৈরি করেন, কিন্তু গোলপোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায় বলটি। প্রথমার্ধে সৌদি আরবও বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও ইরাকি গোলরক্ষক জালাল হাসান ছিলেন অপ্রতিরোধ্য।
দ্বিতীয়ার্ধে সৌদি আরব আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায়। স্ট্রাইকার সালেহ আল-শেহরি ও ফাহাদ আল-মুওয়ালাদের নেতৃত্বে একাধিক আক্রমণ গড়ে তোলে তারা। তবে শেষ পর্যন্ত ইরাকের দৃঢ় রক্ষণ এবং গোলরক্ষক হাসানের দক্ষতায় বল জালে জড়াতে পারেনি কোনো দল। শেষ মুহূর্তে ইরাকের একটি বিপজ্জনক ফ্রি-কিকও নওয়াফ আল-আকিদি অবিশ্বাস্য সেভে রুখে দেন, যা সৌদি দর্শকদের মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দের ঢেউ তোলে।
এই ড্র ফলেই সৌদি আরবের গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত হয়। ১৯৯৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের পর এটি তাদের সপ্তমবারের মতো মূলপর্বে ওঠা। দলটি ২০১৮ রাশিয়া ও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও অংশ নেয়, যেখানে কাতার আসরে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অবিশ্বাস্য জয় এনে ইতিহাস গড়েছিল তারা।
এবারের যোগ্যতা অর্জন তাই তাদের জন্য নতুন করে আত্মবিশ্বাসের বার্তা। সৌদি ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ইয়াসির আল-মিসহাল ম্যাচ শেষে বলেন, “এটি আমাদের কঠোর পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও আত্মবিশ্বাসের ফল। আমাদের খেলোয়াড়রা মাঠে নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়েছেন। আমরা শুধু বিশ্বকাপে অংশ নিতে চাই না, এবার নিজেদের জায়গা আরও শক্ত করতে চাই।”
সৌদি আরবের সমর্থকদের কাছে এটি কেবল একটি খেলার জয় নয়, বরং জাতীয় গর্বের প্রতীক। জেদ্দা, রিয়াদ, দাম্মামসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সমর্থকরা রাতভর উদযাপন করেছে। পতাকা হাতে রাস্তায় নেমেছে মানুষ, গাড়ির কনভয় বের হয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে আনন্দের ছবি ও ভিডিও।
অন্যদিকে, ইরাকের জন্য এটি ছিল এক গভীর হতাশার রাত। দলটি ভালো খেলেও শেষ পর্যন্ত গোলের মুখ দেখতে পারেনি। এখন তাদের অপেক্ষা নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য প্লে-অফ ম্যাচের, যেখানে তারা গ্রুপ ‘এ’-এর রানার্স-আপ সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুখোমুখি হবে। সেই ম্যাচে জয়ী দল আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে অংশ নিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার শেষ সুযোগ পাবে।
ফুটবল বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি আরবের এই সাফল্য আকস্মিক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি ক্রীড়াক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। ইউরোপের শীর্ষ খেলোয়াড়দের নিজেদের ঘরোয়া লিগে টেনে এনে তারা ফুটবল অবকাঠামো ও প্রতিযোগিতার মান বাড়িয়েছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার, করিম বেনজেমাদের মতো তারকা খেলোয়াড়দের উপস্থিতি স্থানীয় খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সৌদি আরবের জাতীয় দলও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন। কোচ রবার্তো মানসিনি দলটিকে নতুন কৌশল ও শৃঙ্খলায় সাজিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা জানতাম, ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচটি কঠিন হবে। কিন্তু আমার ছেলেরা দারুণ মনোবল দেখিয়েছে। এখন আমাদের লক্ষ্য বিশ্বকাপের মূলপর্বে প্রতিযোগিতামূলক পারফরম্যান্স প্রদর্শন করা।”
বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হওয়ার পর সৌদি গণমাধ্যমগুলোতেও চলছে উৎসবমুখর প্রতিবেদন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া ও সৌদি গেজেট জানায়, জেদ্দার স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকের সংখ্যা ছিল ৬০ হাজারেরও বেশি। ম্যাচ শেষে দর্শকরা পতাকা হাতে খেলোয়াড়দের নাম ধরে চিৎকার করে অভিনন্দন জানান।
একই সঙ্গে ফুটবল বিশ্বেও সৌদি আরবের এই সাফল্য প্রশংসিত হচ্ছে। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এক বিবৃতিতে বলেছে, “সৌদি আরবের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এশিয়ান ফুটবলের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তারা প্রমাণ করেছে, সঠিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ একটি দেশকে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে পারে।”
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌদি রাজপরিবারের সদস্যরাও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান টুইটারে লিখেছেন, “আমাদের খেলোয়াড়দের নিয়ে আমরা গর্বিত। এ অর্জন সৌদি যুব সমাজের স্বপ্ন ও অধ্যবসায়ের ফল।”
বিশ্বকাপের মূলপর্বে এবার সৌদি আরবের লক্ষ্য থাকবে গ্রুপ পর্বে টিকে থাকা ও নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া। দেশটির ফুটবল সমর্থকরা আশাবাদী, ২০২২ সালের মতো আবারও কোনো চমক দেখাবে তাদের প্রিয় দল।
দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক উন্নতি, শক্তিশালী প্রশিক্ষণব্যবস্থা ও খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা সৌদি আরবকে এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সম্ভাবনাময় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। জেদ্দার গোলশূন্য ড্র হয়তো পরিসংখ্যানের দিক থেকে খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক জাতির গর্ব, আনন্দ ও স্বপ্নের গল্প।
বিশ্বকাপের পথে টানা তৃতীয়বারের মতো যোগ্যতা অর্জন করে সৌদি আরব শুধু ফুটবল নয়, বরং জাতীয় আত্মবিশ্বাস ও ঐক্যের এক নতুন অধ্যায় রচনা করল। আর সেই মুহূর্তের সাক্ষী ছিল গোটা আরব বিশ্ব—যেখানে এক ড্র ম্যাচই হয়ে উঠল হাজারো মানুষের আনন্দের উপলক্ষ, এক জাতির সাফল্যের প্রতীক।