প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত আবারও রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের জেরে বেলুচিস্তান সীমান্তে মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হওয়া তীব্র গোলাগুলিতে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১২ জন আফগান এবং ৬ জন পাকিস্তানি সেনা সদস্য রয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক বেসামরিক নাগরিক, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে এই সাম্প্রতিক সংঘাত নতুন নয়, তবে এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে আফগান তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ পাকিস্তানকেই সংঘর্ষ শুরুর জন্য দায়ী করেন। তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানি সেনারা প্রথমে সীমান্তে গোলাগুলি শুরু করে, যার জবাবে আফগান বাহিনী পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, “আমাদের ভূখণ্ডে বিনা প্ররোচনায় পাকিস্তানের হামলা আমরা কোনোভাবেই সহ্য করব না। আফগানিস্তানের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের যোদ্ধারা প্রস্তুত।” তিনি জানান, পাকিস্তানের হামলায় ১২ জন আফগান নিহত হয়েছেন এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।
বার্তা সংস্থা এএফপি বোলদাক জেলা হাসপাতালের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, হাসপাতালে আহতদের সারি লেগে গেছে। অনেকেই মারাত্মকভাবে দগ্ধ ও আহত, যাদের মধ্যে অন্তত ৮০ জন নারী ও শিশু। হাসপাতালের পরিচালক বলেন, “রাতভর গোলাগুলি চলেছে। আমরা সারা রাত ধরে রক্তাক্ত মানুষদের হাসপাতালে নিচ্ছিলাম। পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ।”
অন্যদিকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী বলছে, সংঘর্ষ শুরু করেছে আফগান তালেবানই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “আফগান বাহিনী প্রথমে আমাদের সামরিক পোস্টে গুলি চালায়। এতে আমাদের ছয়জন সেনা সদস্য প্রাণ হারান এবং আরও কয়েকজন আহত হন।”
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ আরও দাবি করেছে, আফগানিস্তান সীমান্তের কাছে থাকা তাদের কিছু সামরিক স্থাপনা ও চৌকি লক্ষ্য করে ভারী অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। তবে তালেবান পক্ষ পাল্টা দাবি করে বলেছে, তাদের পাল্টা আক্রমণে পাকিস্তানি সেনাদের বেশ কয়েকজন নিহত হন এবং তারা কিছু সামরিক সরঞ্জাম ও ট্যাংক দখল করেছে।
এই সংঘাত মূলত দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট এবং সীমান্তে সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি ঘিরে। আফগানিস্তান দাবি করে, পাকিস্তান তার অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেয় ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়। অপরদিকে পাকিস্তান অভিযোগ করে, আফগান সীমান্তের ভেতর থেকে টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) বারবার তাদের ভূখণ্ডে হামলা চালাচ্ছে, অথচ আফগান প্রশাসন এসব ঠেকাতে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
এই নতুন সংঘাতের পর বেলুচিস্তান সীমান্তের কয়েকটি এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাতভর গোলাগুলির শব্দে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো প্রায় জনশূন্য হয়ে গেছে। বহু মানুষ নিরাপত্তার জন্য অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহল ইতিমধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়েই উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে এবং সীমান্তে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক সংলাপ পুনরায় শুরু করার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আফগানিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এ ধরনের সংঘাত দেশটির স্থিতিশীলতাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলবে। অন্যদিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সীমান্তে এখনো গোলাগুলি থেমে থেমে চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দু’দেশের সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো শান্তি আলোচনায় বসেনি। তবে আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
একজন বেলুচ সাংবাদিক বলেন, “আমরা এমন সংঘাত বহুবার দেখেছি, কিন্তু এবার মনে হচ্ছে এটি সীমিত সীমান্ত সংঘাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। মানুষ আতঙ্কে আছে, শিশুরা কাঁদছে, কেউই জানে না আগামীকাল কী হবে।”
পাক-আফগান সীমান্তের এই রক্তাক্ত সংঘর্ষ আবারও প্রমাণ করে, দুই দেশের সম্পর্ক এখন চরম অবিশ্বাস ও উত্তেজনার পর্যায়ে পৌঁছেছে। কূটনৈতিক সংলাপ ও সহযোগিতার পরিবর্তে যদি সংঘর্ষই একমাত্র ভাষা হয়ে ওঠে, তবে এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।