গাজায় পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় হামাসের অভিযান শুরু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১৫ বার
গাজায় পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় হামাসের অভিযান শুরু

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ইসরাইলের সঙ্গে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও যুদ্ধবিরতির পর আবারও গাজার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজায় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র অভিযান চালাচ্ছে তারা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং স্থানীয় সহযোগী বাহিনী গঠন করতে হামাসের নিরাপত্তা ইউনিট সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছে। ইতোমধ্যেই কয়েকজনকে ‘ইসরাইলপন্থী সহযোগিতা’র অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের পর হামাসের কালো মুখোশধারী সশস্ত্র সদস্যরা গাজার বিভিন্ন সড়কে টহল শুরু করেছে। তাদের হাতে হামাসের পতাকা, পাশে নিরাপত্তা বাহিনীর ট্রাক ও টহলযান। তারা জানিয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় এখন আর কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা, লুটপাট বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না। হামাসের যোদ্ধারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্রধারী অপরাধী ও ইসরাইলি বাহিনীর সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে গাজার বহু নাগরিক হামাসের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত জীবনের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা হামাসের অভিযানকে ‘আশার আলো’ হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় বাসিন্দা আহমেদ আল-খলিল আল জাজিরা-কে বলেন, “দুই বছর ধরে আমাদের জীবন ছিল ভয় আর অরাজকতায় ভরা। এখন অন্তত মনে হচ্ছে কেউ আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছে।” তবে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, হামাসের এই অভিযান আবারও দমন-পীড়ন ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জন্ম দিতে পারে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই মুহূর্তে গাজায় হামাসের কর্মকাণ্ড কেবল নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টাই নয়, বরং সংগঠনটির রাজনৈতিক প্রভাব পুনর্গঠনেরও একটি কৌশল। যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের নতুন অধ্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হামাস চাইছে আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি ‘শৃঙ্খলাপূর্ণ প্রশাসন’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গৃহীত ২০ দফা শান্তিচুক্তি অনুযায়ী হামাসকে নিরস্ত্র করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে গাজায় এখন তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় হামাসকে প্রশাসনিক কাঠামো থেকে সরিয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর অধীনে গাজার পুনর্গঠন করার কথা বলা হয়েছিল। অথচ আজ হামাসই সেখানে প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে ফিরে এসেছে।

নিউজ ন্যাশন-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গাজার বিভিন্ন অঞ্চলে হামাসের পুনর্গঠিত নিরাপত্তা ইউনিটগুলো নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। তারা গাজা শহর, খান ইউনুস, রাফাহ এবং উত্তরাঞ্চলের ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত। লুট হওয়া মানবিক সহায়তার মালামাল উদ্ধার, চুরি হওয়া অস্ত্র জব্দ এবং অপরাধীদের আটক করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপে ভরা রাস্তাগুলো পরিষ্কার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণেও তারা অংশ নিচ্ছে।

এক হামাস কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “আমরা গাজায় শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছি। যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পাশে থাকা এখন আমাদের দায়িত্ব।” তার দাবি, স্থানীয় জনগণ তাদের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে, কারণ তারা আর বিশৃঙ্খলা চায় না।

তবে ইসরাইল এই অবস্থাকে ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে দেখছে। ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামাস যদি পুনরায় সামরিক শক্তি অর্জনের চেষ্টা করে, তবে চুক্তি ভঙ্গ হয়েছে বলেই বিবেচিত হবে। তাদের দাবি, গাজায় হামাসের পুনর্গঠন যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্বকে বিপদে ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজার বাস্তবতা এখন এক জটিল দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি। একদিকে ইসরাইলি হামলায় বিধ্বস্ত এক ভূখণ্ডের পুনর্গঠন, অন্যদিকে স্থানীয়দের বেঁচে থাকার লড়াই এবং তার মধ্যে হামাসের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দীর্ঘদিনের সংঘাতের পর গাজায় শান্তি ফিরবে কি না—তা এখনো অনিশ্চিত। তবে হামাসের বর্তমান অভিযান ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডে আবারও রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তাপ বেড়ে উঠছে।

গাজার রাস্তায় এখন যুদ্ধের দাগ মুছে দিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে—যেখানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও মানুষ বেঁচে থাকার আশায় শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা খুঁজছে। হামাসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়তো সেই প্রক্রিয়ার অংশ, আবার হয়তো এক নতুন সংঘাতের শুরু।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত