ভেনেজুয়েলায় সিআইএর গোপন অভিযান, অনুমোদন ট্রাম্পের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
ভেনেজুয়েলায় সিআইএর গোপন অভিযান, অনুমোদন ট্রাম্পের

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণা, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-কে ভেনেজুয়েলায় গোপন অভিযান চালানোর অনুমোদন দিয়েছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, তার প্রশাসন এখন শুধু গোপন অভিযানের দিকেই নয়, বরং প্রয়োজনে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে স্থল অভিযান চালানোর বিষয়েও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছে। এই ঘোষণা প্রকাশের পরপরই লাতিন আমেরিকা জুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ক্যারিবিয়ান সাগরে ভেনেজুয়েলার নৌযানে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার জন্য ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করছে। এসব ঘটনার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, “ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে সম্পর্ক এখন এক চরম অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনে আমরা ভেনেজুয়েলার ভেতরেও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।”

কেন যুক্তরাষ্ট্র সিআইএকে ভেনেজুয়েলায় পাঠাচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, তিনি অভিযোগ করেন যে, “ভেনেজুয়েলা তাদের কারাগারগুলো খালি করে কয়েদিদের যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে পাঠিয়ে দিচ্ছে।” দ্বিতীয়ত, তিনি বলেন, দেশটি মাদক পাচারের একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহভাবে পড়ছে। ট্রাম্পের দাবি, “ভেনেজুয়েলা থেকে প্রচুর মাদক সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে। আমরা এতদিন তাদের সমুদ্রে ঠেকিয়েছি, এবার স্থলপথেও তাদের থামাব।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বক্তব্য শুধু একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে এক নতুন ধাপের ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিআইএর গোপন অভিযান সাধারণত এমন দেশগুলোতেই পরিচালিত হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করতে চায় না, কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এই প্রেক্ষিতে ভেনেজুয়েলাকে লক্ষ্য করা মানে, ওয়াশিংটন সম্ভবত আবারও লাতিন আমেরিকার ভূরাজনৈতিক কাঠামোতে নিজেদের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে হাঁটছে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এরইমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে “অবৈধ আগ্রাসন ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন” বলে আখ্যা দিয়েছেন। রাজধানী কারাকাসে এক বক্তব্যে মাদুরো বলেন, “ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা রক্ষায় আমরা যে কোনো ধরনের মার্কিন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ব।” তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং তথ্যযুদ্ধের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলাকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

এরইমধ্যে ক্যারিবিয়ান উপকূলে উভয় দেশই সামরিক বাহিনী মোতায়েন বৃদ্ধি করেছে। ভেনেজুয়েলা তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌবাহিনীর টহল কার্যক্রম জোরদার করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাড়িয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি ও যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি। ফলে পুরো অঞ্চলজুড়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অঘোষিত সামরিক উত্তেজনা, যা সহজেই বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নতুন কিছু নয়। কিউবা, নিকারাগুয়া ও পানামার মতো দেশগুলোতে আগেও ওয়াশিংটনের গোপন অভিযান চালানো হয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয়েছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক বিপর্যয়। তাই ভেনেজুয়েলাতেও একই ধরনের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, তাদের লক্ষ্য কোনো সরকারের পতন নয়, বরং “মাদক ও অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ”। কিন্তু সমালোচকরা মনে করছেন, এটি কেবল রাজনৈতিক আড়াল। তাদের মতে, ট্রাম্প আবারও তার পুরনো ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে লাতিন আমেরিকায় শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন বাড়াতে চাইছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নির্বাচনের প্রাক্কালে ট্রাম্পের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া রাজনীতিতে সমর্থন আদায়ের কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ এখন ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশটির জনগণ এমনিতেই কঠিন সময় পার করছে। এবার যদি যুক্তরাষ্ট্রের গোপন অভিযান সত্যিই শুরু হয়, তবে তা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, “ভেনেজুয়েলায় সিআইএর গোপন অভিযান আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে, কারণ এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ।” তারা আরও সতর্ক করেছে যে, এই ধরনের অভিযান সাধারণত বেসামরিক নাগরিকদের জন্য অপ্রত্যাশিত প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন ওয়াশিংটন ও কারাকাসের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। জাতিসংঘের একাধিক সদস্য রাষ্ট্র ইতোমধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বলেছে, দুই দেশের মধ্যে সংঘাত আরও বেড়ে গেলে তা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।

পরিস্থিতি এখন এক অনিশ্চিত ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করল, কিন্তু এর ফলাফল কেমন হবে—তা এখন সময়ই বলে দেবে। একদিকে মার্কিন প্রশাসন বলছে, এটি মাদকবিরোধী অভিযান; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এটি হয়তো আরও একটি গোপন যুদ্ধ, যা শেষ পর্যন্ত মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত