প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য। তিনি দাবি করেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ভারতের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সাফল্যের প্রতিফলন এবং এর পরবর্তী ধাপে এখন চীনকেও একই পথে আনতে তিনি চেষ্টা করবেন। বুধবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন, যা বিবিসি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্রেমলিনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার অর্থনৈতিক রসদ কমিয়ে দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য। সেই লক্ষ্যেই ওয়াশিংটন মস্কোর জ্বালানি রপ্তানিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। ভারত, চীন ও তুরস্ক বর্তমানে রাশিয়ার তেলের প্রধান ক্রেতা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর থেকে রাশিয়া এশীয় বাজারের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই বাড়িয়েছে।
তবে ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি এখন ধীরে ধীরে রাশিয়ান তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেছি। তিনি আমাকে জানিয়েছেন, ভারত শিগগিরই রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে। এটি একদিনে হবে না, তবে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে গেছে।”
ওয়াশিংটনে ভারতীয় দূতাবাস ট্রাম্পের বক্তব্যের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা প্রেসিডেন্টের দাবিকে না স্বীকার করেছে, না অস্বীকার করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও এই বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি প্রতিক্রিয়া পায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, যদি ট্রাম্পের দাবি সত্য হয়, তাহলে এটি হবে রাশিয়ার জন্য বড় ধাক্কা এবং ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
রাশিয়া বর্তমানে ভারতের প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লি প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করেছে, যা রাশিয়ার মোট তেল রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বারবার চাপ সত্ত্বেও এতদিন মোদি সরকার এই আমদানি অব্যাহত রেখেছিল, কারণ রাশিয়ার তেল তুলনামূলক সস্তা এবং ভারতের জ্বালানি বাজারে এটি স্থিতি এনেছিল।
ভারতের জ্বালানি বিশ্লেষক ড. অনিল কুমার সিংহ বলেন, “ভারত হয়তো রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাবে, তবে পুরোপুরি বন্ধ করা এখনই সম্ভব নয়। ভারতের জ্বালানি চাহিদা এত বেশি যে বিকল্প উৎস পাওয়া সহজ নয়। রাশিয়ার জায়গায় অন্য সরবরাহকারী আনতে সময় ও কূটনৈতিক ভারসাম্য দুটোই প্রয়োজন।”
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন শুধু ভারত নয়, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকেও রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি বন্ধে আহ্বান জানাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বুধবার ওয়াশিংটনে সফররত জাপানি অর্থমন্ত্রী কাটসুনোবু কাতোকে এই প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ওয়াশিংটনের বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ, যার মাধ্যমে তারা মস্কোর অর্থনৈতিক ঘেরাটোপ আরও শক্ত করতে চাইছে।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ভারত তাৎক্ষণিকভাবে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে পারবে না। “এটি একদিনে হবে না,” তিনি বলেন। “তবে প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে, এবং আমরা আশা করছি খুব দ্রুতই এটি শেষ হবে।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর বিশ্ববাজারে তেলের দামে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত যদি সত্যিই রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে, তবে বৈশ্বিক তেলবাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের এই পদক্ষেপ জ্বালানির দামে ঊর্ধ্বগতি ঘটাতে পারে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলায় নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
রাশিয়ার জন্য বিষয়টি আরও গুরুতর। তেল বিক্রি দেশটির অর্থনীতির মূল ভিত্তি। ভারতের মতো বড় ক্রেতা হারালে রাশিয়ার বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যুদ্ধকালীন ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎসও সীমিত হয়ে পড়বে। রাশিয়া ইতোমধ্যে চীন, ইরান ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে, যাতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানো যায়। কিন্তু ভারত হারালে মস্কোর কৌশলগত অবস্থান অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়বে।
এদিকে, রুশ কূটনৈতিক মহল ট্রাম্পের মন্তব্যকে “রাজনৈতিক নাটক” হিসেবে দেখছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, “এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ। ভারত এত দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না যা রাশিয়ার সঙ্গে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষতি করবে।”
ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই ভারসাম্যপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি ওয়াশিংটন ও মস্কো—দু’দিকেই কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়লেও রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও অস্ত্র সহযোগিতা এখনো ভারতের জন্য অপরিহার্য। ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও ভারত কোনো পক্ষ নেয়নি; বরং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করা হলে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি দামে প্রভাব পড়তে পারে। রাশিয়ার সস্তা তেল এখন পর্যন্ত ভারতের অর্থনীতিকে অনেকটা স্থিতিশীল রেখেছে, মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করেছে। তাই হঠাৎ করে সেই উৎস বন্ধ হলে ভারতের অর্থনীতি নতুন চাপে পড়বে।
ট্রাম্পের বক্তব্য তাই শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক জ্বালানি রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট করে দিচ্ছে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ভারতের দিকে—ট্রাম্পের দাবি সত্যি কি না, তা জানতে। ভারত যদি সত্যিই রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে, তবে তা শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই পরিবর্তন আনবে না, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।