প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। নির্বাচনের মাঝপথে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে বহিরাগত নেতাকর্মীদের এনে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার অভিযোগ তুলেছে ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা আমান উল্লাহর নেতৃত্বে বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করানো হয়েছে। অভিযোগ সত্ত্বেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীরা এসব অভিযোগ উত্থাপন করেন। সেখানে তারা দাবি করেন, সকাল থেকেই ছাত্রদলের কর্মীরা ভোটকেন্দ্রের সামনে প্রভাব বিস্তার শুরু করে এবং ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
সংবাদ সম্মেলনে প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থী মুস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “ভোট শুরু হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিচ্ছিলেন। কিন্তু সকাল থেকেই সিরাজী ভবনসহ কয়েকটি কেন্দ্রে দেখা যায় ছাত্রদলের কর্মীরা ভোটারদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। হাতে চিরকুট থাকা শিক্ষার্থীদের ঢুকতে দিচ্ছে না, যদিও নির্বাচন কমিশন আগেই বলেছিল প্রচারপত্র বা চিরকুট নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করা যাবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। কিন্তু কিছু দল বহিরাগত এনে পরিবেশ নষ্ট করছে। কমিশন ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততা শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে।”
সংবাদ সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদপ্রার্থী ফাহিম রেজা আরও অভিযোগ করেন, “ছাত্রদল ও বিএনপির নেতাকর্মীরা বহিরাগত হয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন। এমনকি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা আমান উল্লাহ নিজেও ক্যাম্পাসে এসেছেন। তারা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে গুজব ছড়াচ্ছেন, ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন।”
তিনি বলেন, “আমরা প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে লিখিতভাবে জানিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পুলিশের সাইবার টিমেরও দায়িত্ব ছিল এই গুজব ও প্রভাব বিস্তার রোধ করা, কিন্তু তারাও নিষ্ক্রিয়।”
ফাহিম রেজা আরও অভিযোগ করেন, “ভোটের লাইনে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের ছাত্রদলের কর্মীরা চিরকুট বিলি করেছেন। সকালে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার থাকলেও দুপুরের পর থেকে প্রবেশপথগুলোতে শিথিলতা দেখা গেছে। এতে বহিরাগতদের প্রবেশ সহজ হয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমরা চাই না নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো অস্থিরতা তৈরি হোক। শিক্ষার্থীরা সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছেন, তাদের সেই গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ যেন বিঘ্নিত না হয়। আমরা ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করব।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশে কঠোর অবস্থান নিয়েছি। অভিযোগ পেলে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। সংগঠনটির এক নেতা দাবি করেছেন, “রাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে, কিন্তু বহিরাগত আনার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমাদের কোনো কেন্দ্রীয় নেতা ক্যাম্পাসে যাননি।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ এক যুগ পর রাকসু নির্বাচন আয়োজন করছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। সকাল থেকে ভোটারদের দীর্ঘ সারি, উচ্ছ্বসিত মুখ আর নির্বাচনী আমেজে মুখর ছিল ক্যাম্পাস। তবে দুপুরের পর থেকেই একাধিক অনিয়ম, বাধা ও গুজব ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে নির্বাচনী পরিবেশে।
শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলছেন, এত বছর পর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচন নিয়ে তারা আশা করেছিলেন একটি উদাহরণযোগ্য সুষ্ঠু ভোট হবে। কিন্তু বহিরাগত প্রবেশ, প্রভাব খাটানো ও প্রশাসনের নিরব ভূমিকা সেই প্রত্যাশায় আঘাত হেনেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে রাকসু সব সময়ই শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তাই এ নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা কেবল একটি সংগঠন নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা—বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, যাতে রাকসু নির্বাচন সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক চর্চার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।