প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেট অঞ্চলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও উদ্দীপনার পরিবর্তে বিরাজ করছে একধরনের নিস্তব্ধতা ও অনাগ্রহ। একসময় ভোটের মৌসুমে সড়কজুড়ে ব্যানার, পোস্টার ও প্রচারণার কোলাহলে মুখর হয়ে উঠত সিলেটের পাঁচ আসন, কিন্তু এবার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ভোটের আমেজ যেন উধাও হয়ে গেছে।
নির্বাচন ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের কিছু ব্যানার–ফেস্টুন টানানো হলেও তা মানুষের চোখে পড়ছে না বললেই চলে। সিলেট নগরীর কাজলশাহ, জিন্দাবাজার, সুবিদবাজার ও দক্ষিণ সুরমা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভোটের বিষয়ে মানুষের আগ্রহ সীমিত, আলোচনাও প্রায় নেই। চায়ের দোকান কিংবা হাটবাজারে যেখানে আগে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি, উন্নয়ন পরিকল্পনা বা ভোটের হিসাব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলত, সেখানে এখন নিরবতা।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা, পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা অতীতে অনেক আশা নিয়ে ভোট দিয়েছি। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা কখনও মানুষের সমস্যার কথা শোনেননি। রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল—সব জায়গায় অব্যবস্থা। তাই এখন ভোট নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। শুধু শান্তি থাকলেই ভালো।”
একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করেছেন সিলেটের দক্ষিণ সুরমার এক শিক্ষকও। তার ভাষায়, “ভোট মানে এখন শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের খেলা। সাধারণ মানুষের জীবনে তেমন পরিবর্তন আসে না। তাই এবার অনেকেই চুপচাপ।”
সিলেটের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নীরবতা কেবল নির্বাচনী উদাসীনতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আস্থাহীনতার প্রতিফলন। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা, উন্নয়ন প্রকল্পের বৈষম্য, দুর্নীতি এবং দলীয় প্রতিশ্রুতির ভঙ্গ—সব মিলিয়ে মানুষের মনে তৈরি হয়েছে হতাশা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ভোট নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদাসীন। তাদের মতে, ভোট দিয়ে কোনো পরিবর্তন আসে না, তাই এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ায় আর কোনো মানে নেই।
অন্যদিকে, স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের একটি অংশ এখনো মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা বলছেন, শেষ মুহূর্তে প্রার্থীদের প্রচারণা জোরদার হলে পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। তবে সেই আশাও খুব ক্ষীণ। কারণ, সিলেটের নির্বাচনী মাঠে এখনো বড় কোনো ইস্যু বা প্রার্থী মানুষের মন কেড়ে নিতে পারেনি।
একজন প্রবীণ নাগরিক বলেন, “আগে ভোট মানেই ছিল উৎসব। সকালে সবাই সাজসজ্জা করে কেন্দ্রে যেত। এখন ভোট মানে ভয়, সন্দেহ আর অনিশ্চয়তা। মানুষ এখন চায় শান্তি—যে-ই আসুক, যেন অশান্তি না হয়।”
এদিকে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রচারে মনোযোগ দিলেও জনমানুষের অনাগ্রহ তাদের জন্য এক বড় বার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাণ হলো জনগণের অংশগ্রহণ। কিন্তু যদি মানুষ ভোটে আগ্রহ হারায়, তবে সেই ব্যবস্থার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
সিলেটের আসন্ন নির্বাচনে তাই এখন মূল প্রশ্ন একটাই—মানুষ কি আবার ভোটের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনবে, নাকি এই নীরবতাই দেশের রাজনীতির নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠবে?