যুক্তরাষ্ট্রে ‘নো কিংস’ ব্যানারে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল দেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৫ বার
যুক্তরাষ্ট্রে ‘নো কিংস’ ব্যানারে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল দেশ

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আবারও উত্তাল রাস্তাঘাট—এবার ‘নো কিংস’ (No Kings) স্লোগানে ডোনাল্ড ট্রাম্পবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে দেশজুড়ে অসংখ্য মানুষ। গণতন্ত্রের রক্ষায় এবং কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শনিবার (১৮ অক্টোবর) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে একযোগে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। আন্দোলনের মুখ্য বার্তা ছিল, “আমেরিকায় কোনো রাজা নয়, কেবল জনগণের শাসন।”

নিউইয়র্কের বিখ্যাত টাইমস স্কয়ারে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা বিক্ষোভে হাজারো মানুষ অংশ নেন। তাদের হাতে ছিল নানা রঙের ব্যানার, পতাকা ও প্ল্যাকার্ড, যেখানে লেখা ছিল “Democracy, not Monarchy”, “No Kings in America” এবং “Stop Trump’s Power Grab”। বিভিন্ন শহরে একই সময়ে মিছিল, সমাবেশ ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। ওয়াশিংটন ডিসি, লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো, মায়ামি, বোস্টন, সান ফ্রান্সিসকো—সবখানেই ছিল এক অভিন্ন বার্তা: ট্রাম্পের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।

রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবার সারাদেশে প্রায় আড়াই হাজার স্থানে এই আন্দোলনের কর্মসূচি পালিত হয়। বড় শহরগুলোর পাশাপাশি ছোট ছোট নগরী ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাগুলোতেও মানুষ নিজেদের হাতে তৈরি পোস্টার ও ব্যানার নিয়ে প্রতিবাদে যোগ দেন। কিছু শহরে নাগরিক সংগঠন, মানবাধিকার কমিশন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এই গণপ্রদর্শনের অংশ নেয়।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকে বলেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হয়ে নয়, বরং রাজা হয়ে আচরণ করছেন। তার একতরফা সিদ্ধান্ত, বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি, প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিরোধীদের দমন এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি অবজ্ঞা—এসবই গণতন্ত্রের মূল কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

বিক্ষোভকারীদের একজন, নিউইয়র্কের শিক্ষিকা জেনি ম্যাকার্থি, বলেন, “আমরা স্বাধীনতা ও ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করছি। ট্রাম্প নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেছেন। আমেরিকায় কোনো রাজা থাকবে না—এটাই আমাদের বার্তা।”

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরও অনেকে জানান, দীর্ঘ ১৮ দিন ধরে সরকারি কার্যক্রম আংশিকভাবে বন্ধ থাকার (শাটডাউন) মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের অদক্ষতা ও অহংকার জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল মলে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে বক্তারা বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড মার্কিন গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ও সাংবিধানিক ভারসাম্যের জন্য ভয়ংকর হুমকি।”

আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (ACLU) জানায়, তারা আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের একটি দল মাঠে রেখেছে যাতে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক এলেন টার্নার বলেন, “এটি কেবল ট্রাম্পবিরোধী আন্দোলন নয়, বরং আমেরিকার সংবিধান ও জনগণের অধিকার রক্ষার লড়াই।”

‘নো কিংস’ আন্দোলনের বিক্ষোভে যোগ দেন হলিউডের নামী তারকারাও। অভিনেত্রী জেন ফন্ডা, কেরি ওয়াশিংটন, সংগীতশিল্পী জন লেজেন্ড, অভিনেতা অ্যালান কামিং ও জন লেগুইজামো রাস্তায় নেমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। তাদের উপস্থিতি আন্দোলনে বাড়তি উদ্দীপনা যোগ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরও গতি পায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিক্ষোভ আধুনিক মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ নাগরিক প্রতিবাদে পরিণত হতে পারে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ৩০ লাখ মানুষ দেশজুড়ে এ আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। এটি ২০১৭ সালের নারী মার্চের পর যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় গণসমাবেশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “তারা আমাকে রাজা বলে ডাকছে, কিন্তু আমি কোনো রাজা নই। আমি জনগণের জন্য কাজ করছি।” তবে তার এই বক্তব্য বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। তারা দাবি করছেন, ট্রাম্পের কথাবার্তা ও কাজের মধ্যে দ্বিচারিতা রয়েছে।

বিক্ষোভের ঢেউ কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপেও। লন্ডন, মাদ্রিদ ও বার্সেলোনায় মার্কিন দূতাবাসের সামনে শত শত মানুষ প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ইউরোপীয় বিক্ষোভকারীরা বলেন, আমেরিকার গণতন্ত্র হুমকিতে পড়লে তার প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়বে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রবার্ট হ্যানসন বলেন, “এই আন্দোলন মার্কিন জনগণের গভীর উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। তারা মনে করছে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে। আমেরিকান ইতিহাসে এমন সময় খুব কমই এসেছে যখন জনগণ এত একত্রে শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।”

বিক্ষোভ শেষে টাইমস স্কয়ারে আয়োজিত সমাবেশে আন্দোলনের আহ্বায়ক মারিয়া হোয়াইট বলেন, “আমরা আজ রাস্তায় নেমেছি কারণ আমরা বিশ্বাস করি, আমেরিকার ভবিষ্যৎ জনগণের হাতে থাকতে হবে, কোনো ব্যক্তির হাতে নয়। আমরা লড়ব যতদিন পর্যন্ত স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হয়।”

দেশজুড়ে শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ শেষ হলেও বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা রয়ে গেছে। অনেকেই মনে করছেন, যদি প্রশাসন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে জনগণের দাবির প্রতি সাড়া না দেয়, তবে এই আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারে।

গণতন্ত্র রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ আজ নতুন ইতিহাস লিখছে—যেখানে নাগরিক, রাজনীতিক ও শিল্পী এক কণ্ঠে বলছেন, “আমেরিকায় কোনো রাজা নেই, শুধু জনগণের শাসন থাকবে।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত