প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফুটবল বিশ্বে আবারও ইতিহাস লেখা হলো। এবারে সেই ইতিহাসের রচয়িতা আফ্রিকার দেশ মরক্কো। বিশ্বজুড়ে আলোচনায় থাকা দল আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে মরক্কো জয় করল ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের শিরোপা। চিলির সান্তিয়াগোর এস্তাদিও ন্যাসিওনাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রোমাঞ্চকর ফাইনালে ২-০ গোলে জয় তুলে নিয়ে মরক্কো শুধু নিজেরাই নয়, গোটা আফ্রিকা মহাদেশকেই আনন্দে ভাসিয়েছে।
এটি মরক্কোর ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অর্জন। যেকোনো বয়সভিত্তিক বিশ্বকাপে এটাই তাদের প্রথম শিরোপা। ঘানার পর দ্বিতীয় আফ্রিকান দেশ হিসেবে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে ট্রফি জয়ের কীর্তি গড়ল অ্যাটলাস লায়নরা। এই জয়ে মরক্কো শুধু একটি ট্রফি নয়, জিতে নিলো বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবলপ্রেমীর ভালোবাসা ও সম্মান।
ফাইনালে মাঠে নামার আগে আর্জেন্টিনা ছিল টুর্নামেন্টের অপ্রতিরোধ্য দল। সাতবারের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নে তারা যখন মাঠে নামে, তখন প্রায় সবাই ধরে নিয়েছিল আর্জেন্টিনারই হবে জয়। কিন্তু সান্তিয়াগোর রাতটা লিখে দিল এক নতুন কাহিনি। ম্যাচের শুরু থেকেই মরক্কো আক্রমণাত্মক খেলা শুরু করে। বল দখলে পিছিয়ে থেকেও তারা প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করতে থাকে।
মাত্র ১২ মিনিটে ইয়াসির জাবিরির পায়ের জাদুতে এগিয়ে যায় মরক্কো। বাঁ দিক থেকে আসা এক দারুণ পাসে বল পেয়ে তিনি যে গোলটি করেন, সেটি ছিল নিখুঁত টেকনিক আর ঠাণ্ডা মাথার উদাহরণ। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ তখনও সামলে ওঠেনি, এর ১৭ মিনিট পরই আবার আঘাত হানে মরক্কো। একই ফুটবলার জাবিরির পা থেকে আসে দ্বিতীয় গোল। আর্জেন্টিনার হতভম্ব ডিফেন্সের সামনে তিনি যেন ছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য ঝড়।
প্রথমার্ধে ২-০ গোলের লিড নিয়ে বিরতিতে যায় মরক্কো। দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা মরিয়া হয়ে ওঠে ফেরার আশায়। লিওনেল মেসির দেশের তরুণ তারকারা বলের নিয়ন্ত্রণ নিলেও মরক্কোর রক্ষণভাগের সামনে তারা ব্যর্থ হয় বারবার। মরক্কোর গোলরক্ষক ইউসুফ হামদান বারবার সেভ করে দলের ভিত্তি মজবুত রাখেন।
শেষ পর্যন্ত সময় গড়ালেও আর কোনো গোলের দেখা মেলেনি। রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় মরক্কোর উল্লাস। খেলোয়াড়রা পতাকা হাতে দৌড়ে যান দর্শকদের দিকে, কোচ ও স্টাফরা আলিঙ্গনে ভাসেন। স্টেডিয়ামে তখন শুধু একটাই স্লোগান—“ভিভা মরোকো!”
ফাইনালের দুই গোল করে দেশের প্রথম বিশ্বকাপ জয় নিশ্চিত করেন ইয়াসির জাবিরি। টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে তিনি পান ‘সিলভার বল’ পুরস্কার। পাঁচ গোল করে তিনি যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেও সামান্য ব্যবধানে হারিয়ে ফেলেন ‘গোল্ডেন বুট’। তবে তার নির্ভুল ফিনিশিং, গতি এবং দৃঢ় মানসিকতা সবার মন জয় করেছে।
এদিকে মরক্কোর অধিনায়ক ওথমান মামা পুরো আসরজুড়ে ছিলেন দলের প্রাণভোমরা। মিডফিল্ড থেকে খেলা সাজানো, সঠিক পাস বিতরণ আর নেতৃত্বদানের দক্ষতার কারণে তিনিই জিতেছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’। অন্যদিকে, ফাইনালের আগ পর্যন্ত কোনো গোল না খাওয়া আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক সান্তিনো বার্বি পান ‘গোল্ডেন গ্লাভস’।
মরক্কোর এই জয় শুধু একটি ফুটবল ট্রফি জয় নয়, এটি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে আফ্রিকার ফুটবলের জন্য। বহু বছর ধরে ইউরোপ-লাতিন আমেরিকার আধিপত্যে থাকা এই মঞ্চে মরক্কোর সাফল্য নতুন অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে আফ্রিকার তরুণ প্রজন্মের কাছে।
দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাজপরিবার—সবাই তাদের এই ঐতিহাসিক জয় উদযাপন করেছে। রাজধানী রাবাতে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে পতাকা হাতে, গান গেয়ে আর নাচে মেতে। ফুটবলের এই সাফল্য যেন মরক্কোর জাতীয় ঐক্য ও গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আর্জেন্টিনার জন্য দিনটি ছিল হতাশার। তারা স্বপ্ন দেখেছিল সপ্তমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার, কিন্তু মরক্কোর তরুণদের দৃঢ়তা আর শৃঙ্খলার কাছে হার মানতে হলো। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার কোচ বলেন, “আমরা ভালো খেলেছি, কিন্তু মরক্কো আজ ছিল অপ্রতিরোধ্য। তারা যে শিরোপা জিতেছে, তা প্রাপ্য।”
ফুটবল ইতিহাসে এই জয় তাই শুধু একটি দেশের নয়, একটি মহাদেশের, যারা প্রতিবারই প্রমাণ করছে—ফুটবলের জাদু এখন আর কোনো এক অঞ্চলের একচেটিয়া নয়। মরক্কো দেখিয়ে দিল, স্বপ্ন, সাহস আর দলগত স্পিরিট থাকলে অসম্ভব বলে কিছুই নেই।