প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেলিরাই গ্রামে শুক্রবার সকালে একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাকের (৬০) রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বাসার ছাদ থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, রাতের কোনো এক সময়ে তাকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে, এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে গভীর ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
নিহত আবদুর রাজ্জাক ছিলেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তেলিরাই গ্রামের মরহুম মৌলুল হোসেনের ছেলে রাজ্জাকের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, প্রতিদিনের মতোই শুক্রবার ভোরে ফজরের নামাজ আদায় শেষে তিনি বাসার ছাদে হাঁটতে যান। সকাল নয়টার দিকে পরিবারের সদস্যরা যখন তাকে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাননি, তখন তারা ছাদে গিয়ে দেখেন রাজ্জাক রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। তার শরীরের কয়েকটি স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। ঘটনাস্থল দেখে পরিবারের সদস্যরা ধারণা করছেন, খুব কাছ থেকে আক্রমণ করা হয়েছে।
খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে এবং প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে নয়টার মধ্যে সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “নিহতের শরীরে একাধিক জায়গায় ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আমরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছি এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে কাজ শুরু হয়েছে।”
পুলিশ কর্মকর্তার মতে, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে বাসার ভেতরের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জানা গেছে, ওই বাড়িতে নিহতের এক ভাই, ছেলে ও পুত্রবধূ ছাড়া অন্য কেউ থাকতেন না। বাড়িটি চারদিক থেকে সুরক্ষিত এবং বাইরে থেকে কারো পক্ষে সহজে ভিতরে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। এই তথ্য পুলিশকে ভাবিয়ে তুলেছে—এটি কি পরিবারের ভেতরের কোনো দ্বন্দ্বের ফল, নাকি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড?
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজ্জাক কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে আসেন। জুলাই বিপ্লবের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি দেশ ছাড়েন বলে প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন। প্রায় এক বছর আমেরিকায় অবস্থান করার পর কয়েক মাস আগে দেশে ফিরে এসে তিনি পরিবারের সঙ্গে নিজ বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। তবে দেশে ফেরার পর থেকেই তার পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে নিকটাত্মীয়দের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। স্থানীয়দের অনেকে ধারণা করছেন, সেই বিরোধ হয়তো এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলে কেউ কেউ মনে করছেন, এটি শুধুমাত্র পারিবারিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং রাজ্জাকের অতীত রাজনৈতিক অবস্থান ও কার্যকলাপও হয়তো তাকে টার্গেট করেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “রাজ্জাক ভাই দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তিনি সবসময় খোলামেলা কথা বলতেন, যা অনেক সময় কারও কারও অপছন্দের কারণ হতো। তবে এভাবে তাকে হত্যা করা—এটি নিঃসন্দেহে পরিকল্পিত।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থল থেকে একটি ধারালো অস্ত্রের খাপ, একটি মোবাইল ফোন এবং কিছু রক্তমাখা কাপড় উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তদন্ত দল ইতিমধ্যে বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা করছে, যদিও প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ওই সময় বিদ্যুৎ না থাকায় রেকর্ডিং বন্ধ ছিল।
নিহতের ছেলে জানান, তার বাবার কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। তবে সম্প্রতি সম্পত্তি সংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ে পরিবারের মধ্যে মতবিরোধ চলছিল। তিনি বলেন, “আমরা নিজেরাও বুঝতে পারছি না, কে এমন কাজ করতে পারে। বাবা কাউকে কোনো কষ্ট দেননি।”
ঘটনার পর থেকে এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। গ্রামের মানুষজন সকাল থেকেই বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে পুলিশের তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
সিলেট মহানগর পুলিশের একটি বিশেষ তদন্ত টিমকে ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা হত্যার মোটিভ, সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের সঙ্গে নিহতের সম্পর্ক, এবং সম্পত্তি বা রাজনীতি—দুই দিকই সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। পুলিশের ভাষায়, “এটি একটি জটিল মামলা। আপাতদৃষ্টিতে পারিবারিক মনে হলেও, আমরা সব দিক খতিয়ে দেখছি।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, দেশে ফেরার পর থেকেই রাজ্জাক কোনো হুমকির মুখে ছিলেন কিনা। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, তার বিদেশ যাত্রা এবং ফিরে আসার সময়কার রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে ঘটনাটির যোগ থাকতে পারে।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, রাজ্জাক ছিলেন সমাজসেবামূলক কাজে সক্রিয় ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তার এমন অকাল মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকায় শোক নেমে এসেছে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর তদন্তের দিক আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে, এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের তালিকা প্রণয়ন করছে।
একটি প্রাণহানির এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—বাংলাদেশের রাজনীতি ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব কখনও কখনও কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া শুরু না হলে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের রহস্য আরও ঘনীভূত হয়ে উঠবে।