প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে আজ শনিবার (১ নভেম্বর) থেকে কার্যকর হচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নতুন সিদ্ধান্ত—একজন গ্রাহক তার জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সর্বোচ্চ ১০টি সক্রিয় সিম রাখতে পারবেন। এর বেশি সিম থাকলে সেগুলো আজ থেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। মোবাইল অপারেটররা ইতোমধ্যেই গ্রাহকদের এসএমএসের মাধ্যমে সতর্ক করেছে, যাতে তারা নিজ নিজ এনআইডির অধীনে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন।
বিটিআরসি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) মধ্যরাতের পর অতিরিক্ত সিমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আজ শনিবার থেকে দেশে আর কোনো এনআইডির অধীনে ১০টির বেশি সক্রিয় সিম থাকবে না। এই উদ্যোগের মাধ্যমে সিম ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো, প্রতারণা রোধ, এবং গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সংস্থাটির মূল লক্ষ্য।
২০২৫ সালের ৩০ জুলাই বিটিআরসি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, একজন নাগরিক সর্বোচ্চ ১০টি সিম রাখতে পারবেন। এর বেশি থাকলে নভেম্বর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, অতিরিক্ত সিম গ্রাহকদের নিজ দায়িত্বে কাস্টমার কেয়ার সেন্টারের মাধ্যমে ডি-রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এর আগে একজন নাগরিক তার এনআইডির বিপরীতে ১৫টি সিম রাখতে পারতেন।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, “শনিবার থেকেই অপারেটররা অতিরিক্ত সিম নিষ্ক্রিয় করার কাজ শুরু করেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা নিশ্চিত করব, কোনো এনআইডির নামে ১০টির বেশি সক্রিয় সিম থাকবে না।” তিনি আরও বলেন, “দেশে অনেক দিন ধরেই সিম ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা ছিল। একই এনআইডিতে একাধিক ব্যক্তি সিম নিবন্ধন করে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করত। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতারণা, অবৈধ লেনদেন এবং সাইবার অপরাধ কমে আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে সক্রিয় মোবাইল সিমের সংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ৬২ লাখ। অথচ প্রকৃত মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাত্র ৬ কোটি ৭৫ লাখ। এতে স্পষ্ট হয় যে, অনেকের নামে একাধিক সিম নিবন্ধিত রয়েছে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ৮০ শতাংশ গ্রাহকের নামে ৫টির কম সিম রয়েছে, ৬ থেকে ১০টি সিম আছে প্রায় ১৬ শতাংশের, আর মাত্র ৩ শতাংশ গ্রাহক ব্যবহার করছেন ১১টির বেশি সিম। অর্থাৎ এই ক্ষুদ্র অংশের ব্যবহারকারীদের কারণেই দেশের মোট সিম সংখ্যায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দিচ্ছিল।
বিটিআরসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়; এটি একটি নিরাপত্তা উদ্যোগও। দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মোবাইলভিত্তিক প্রতারণা, ফিশিং, এবং অবৈধ অর্থ লেনদেন। অনেক সময় দেখা যায়, অপরাধীরা অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে সিম নিবন্ধন করে নেয় এবং সেই সিম ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালায়। এর ফলে নির্দোষ নাগরিকের নামেও মামলা হয়, যা ভয়াবহ ভোগান্তির সৃষ্টি করে। তাই এই সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে নাগরিক সুরক্ষাই মূলত নিশ্চিত করতে চায় বিটিআরসি।
গ্রাহকদের সুবিধার্থে বিটিআরসি জানিয়েছে, তারা সহজেই *১৬০০২# ডায়াল করে বা অনলাইন পোর্টালে গিয়ে নিজেদের এনআইডিতে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা যাচাই করতে পারবেন। এতে একজন ব্যবহারকারী বুঝতে পারবেন তার নামে কতটি সিম সক্রিয় আছে, এবং প্রয়োজনে কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে ডি-রেজিস্ট্রেশনের আবেদন করতে পারবেন।
তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে কিছু উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী, অনলাইন উদ্যোক্তা, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারকারী এবং একাধিক মোবাইল অপারেটরের সেবা গ্রহণকারী গ্রাহকদের মধ্যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যে, ‘দৈবচয়ন’ বা র্যান্ডম সিলেকশন পদ্ধতির কারণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সিমও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অনেকের ব্যবসায়িক যোগাযোগ, বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্ট, এমনকি জরুরি পরিবারের যোগাযোগ সিমও এই প্রক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় হতে পারে।
মোবাইল অপারেটরগুলোর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। প্রথমে অতিরিক্ত সিমগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে, এরপর গ্রাহকদের এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। গ্রাহক চাইলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের অগ্রাধিকার সিম বাছাই করে রাখতে পারবেন। তবে ১০টির সীমার বাইরে কোনো ছাড় থাকবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিটিআরসির এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আনবে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাসান মাহমুদ মনে করেন, “এই সিদ্ধান্ত অনেকাংশে সাইবার নিরাপত্তা ও নাগরিক সুরক্ষাকে শক্তিশালী করবে। কারণ অপরাধীরা সাধারণত ভুয়া সিম ব্যবহার করে থাকে। সিম সীমা কমলে তাদের গতিবিধি ট্র্যাক করা সহজ হবে।” তবে তিনি এও বলেন, “এখন প্রয়োজন যথাযথ প্রয়োগ। যেন কোনো নির্দোষ গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।”
এদিকে, গ্রাহকদের অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ বলছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগে যদি বিটিআরসি পর্যাপ্ত জনসচেতনতা তৈরি করত, তবে হঠাৎ করে এত সিম বন্ধ হয়ে ভোগান্তি কম হতো। অন্যদিকে অনেকে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, “অপরাধীদের লাগাম টানতে হলে এই পদক্ষেপ দরকার ছিল অনেক আগে।”
সব মিলিয়ে আজ থেকে কার্যকর হওয়া বিটিআরসির এই নীতিমালা বাংলাদেশের টেলিকম খাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু সিম ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনবে না, বরং ডিজিটাল নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি করবে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে কতটা ন্যায়সংগতভাবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় এবং গ্রাহকদের কতটা সহায়তা দেওয়া হয় তার ওপর।
নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে এই উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি হবে টেলিকম খাতের জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য।