হাসিনার রায় বিলম্বিত করার নতুন কূটকৌশল, নভেম্বরে রায় অনিশ্চিত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৯ বার
২৩০ বছর পর ক্ষমতাচ্যুত কোনো নারী সরকারপ্রধানের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ শেখ পরিবারের বিরুদ্ধে রাজউকের প্লট দুর্নীতির ছয় মামলার রায় নভেম্বরের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতদিন পর্যন্ত ধারণা করা হচ্ছিল যে নভেম্বরের মধ্যেই এই বহুল আলোচিত মামলাগুলোর বিচারকাজ শেষ হবে এবং রায়ও ঘোষণা করা হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক ঘটনায় মামলাগুলোর গতিপথে পরিবর্তন এসেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে রায় ঘোষণার সময়সীমা আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর দুদক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মোমেন আশা প্রকাশ করেছিলেন যে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দাখিল করা ছয়টি মামলার রায় অক্টোবরের শেষ নাগাদ বা নভেম্বরের মধ্যে হতে পারে। দুদকের প্রসিকিউশন টিমও মামলাগুলোর শুনানি প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই এক পলাতক আসামির আত্মসমর্পণ পুরো পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে।

গত ২৯ অক্টোবর রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এরপরই মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। আদালত তার জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই আত্মসমর্পণকে অনেকে “কৌশলগত পদক্ষেপ” হিসেবে দেখছেন, যা শেখ পরিবারের বিচার বিলম্বিত করার নতুন এক পন্থা হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আদালত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা পরিবার মামলাগুলোর অন্যতম আসামি হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে এই বিচার নিয়ে দেশ-বিদেশে আগ্রহ রয়েছে। বিচার শেষ হলে আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তাই আত্মসমর্পণের মাধ্যমে একের পর এক আসামি আদালতের প্রক্রিয়ায় নতুন বাঁক আনতে চাইতে পারে।

দুদকের এক সিনিয়র আইন কর্মকর্তা বলেন, “এটি একটি স্পষ্ট কৌশল। আসামিরা পর্যায়ক্রমে আত্মসমর্পণ করে সাক্ষী রিকল করার আবেদন করতে পারে, যা বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করবে। আদালত বাধ্য হবে প্রতিটি সাক্ষীকে পুনরায় হাজির করে জেরা করার সুযোগ দিতে।”

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪০ ধারা অনুযায়ী, আদালত ন্যায়ের স্বার্থে সাক্ষীকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন। অর্থাৎ, আত্মসমর্পণ করা আসামি চাইলে তার বিরুদ্ধে দেওয়া সাক্ষ্য পুনরায় পর্যালোচনা করতে পারেন, যা আইনি অধিকার হলেও তা অনেক সময় মামলার সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়।

এই প্রসঙ্গে দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর দেলোয়ার জাহান রুমি বলেন, “আসামি আত্মসমর্পণ করেছে, তাই তার আইনগত অধিকার আছে সাক্ষী রিকল করার। আমরা বিচার দ্রুত শেষ করতে চাই, কিন্তু আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতেই হবে। সামান্য বিলম্ব হতে পারে, তবে বিচার হবেই।”

অন্যদিকে আসামির আইনজীবী এডভোকেট শাহীনুর রহমান বলেছেন, তিনি এখনো সাক্ষী রিকল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি বলেন, “আমি রেকর্ড দেখব, যদি মনে হয় সাক্ষী পুনরায় জেরা প্রয়োজন, তবেই আবেদন করব।”

এর আগে গত ৩১ জুলাই শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাসহ শেখ পরিবারের সাত সদস্য এবং আরও ১৬ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করার নির্দেশ দেন ঢাকার দুটি বিশেষ জজ আদালত।

এর মধ্যে তিন মামলার শুনানি চলছে পঞ্চম বিশেষ জজ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনের আদালতে, যেখানে আসামি হিসেবে রয়েছেন শেখ হাসিনা, তার ছেলে জয় ও মেয়ে পুতুল। অন্য তিন মামলার বিচার চলছে চতুর্থ বিশেষ জজ রবিউল আলমের আদালতে, যেখানে আসামি শেখ রেহানা ও তার সন্তানরা।

আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোট ৬৩ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই রাজউকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এখন যদি আত্মসমর্পণ করা আসামিদের কারণে সাক্ষী পুনরায় হাজির করতে হয়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়া কয়েক মাস পিছিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন আইনজীবীরা।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের অক্টোবরে দৈনিক যুগান্তর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ পায়। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বরাদ্দ পাওয়া ছয়টি প্লটে অনিয়ম, প্রভাব খাটানো এবং নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্তের অভিযোগ ওঠে।

পরে হাইকোর্ট তদন্তের নির্দেশ দেন এবং দুদককে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে বলেন। ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করে এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০২৫ সালের ১০ মার্চ শেখ পরিবারের সাতজনসহ ২৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র অনুমোদন করে।

এসব মামলায় শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক এবং আজমিনা সিদ্দিকসহ শেখ পরিবারের সদস্যরা আসামি। পাশাপাশি রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, প্রকৌশলী এবং মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা অভিযুক্ত হয়েছেন।

সবশেষ পরিস্থিতি বলছে, আত্মসমর্পণ ও সাক্ষী রিকলের এই নতুন অধ্যায় মামলার নিষ্পত্তিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আইনজীবীরা বলছেন, নভেম্বরের মধ্যে রায় হওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল, তা এখন প্রায় অসম্ভব। আদালতের নতুন তারিখ নির্ধারণ ও সাক্ষী রিকল প্রক্রিয়া শুরু হলে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি আগামী বছর পর্যন্ত গড়াতে পারে।

দুদক ও আদালত সূত্রের মতে, মামলাগুলোর রায় বিলম্বিত হলেও তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বিচার শেষ করার বিষয়ে। তবে রাজনৈতিকভাবে এই বিলম্ব শেখ হাসিনা পরিবারের জন্য সাময়িক স্বস্তি এনে দিতে পারে, যা অনেকের চোখে ‘কূটকৌশল’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত