প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট না হলে সেই নির্বাচনের কোনো অর্থ বা মূল্য থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “গণভোট ছাড়া নির্বাচন মানে জনগণের মতামত উপেক্ষা করা, জনগণের অধিকার হরণ করা।” শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে ফেরার পথে পূর্ব লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে গণভোট ও নির্বাচনের প্রস্তুতি ঘিরে দেশের রাজনীতিতে যে বিতর্ক চলছে, তার মধ্যে জামায়াত আমিরের এই মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “গণতন্ত্র মানে জনগণের মতামতের প্রতিফলন। যদি সেই মতামত যাচাইয়ের কোনো সুযোগই না দেওয়া হয়, তবে সেটি কেবল ক্ষমতা দখলের খেলা ছাড়া কিছু নয়। আমরা গণভোটের মাধ্যমে জানতে চাই— জনগণ কার পক্ষে, তারা কেমন বাংলাদেশ চায়।”
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোতে বিরোধী দলগুলোর জন্য কোনো কার্যকর রাজনৈতিক পরিবেশ নেই। তার মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ করা, সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ভয়ভীতি ছড়িয়ে নির্বাচন আয়োজন করলে তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।
জামায়াত আমির বলেন, “বাংলাদেশে যারা আজ ক্ষমতায়, তারা গণতন্ত্রের কথা বললেও প্রকৃত গণতন্ত্রের শত্রু। আমরা চাই, জনগণের রায়েই ভবিষ্যৎ সরকার নির্ধারিত হোক। কিন্তু গণভোট ছাড়া তা সম্ভব নয়। গণভোট হবে, তারপরই নির্বাচন— এটাই জনগণের প্রত্যাশা।”
তিনি আরও বলেন, “আজ দেশের মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। যারা কথা বলছে, তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ভয়াবহ দমননীতি চলছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ইসলামি আন্দোলন কখনো দমন করে থামানো যায় না। জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করেই আমরা এগোতে চাই।”
সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিও আহ্বান জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “প্রবাসীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির রক্তধারা। অথচ তারা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। আমরা ক্ষমতায় গেলে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করব। ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় বিদেশ থেকে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারেন।”
তিনি আরও দাবি করেন, তার দল ক্ষমতায় গেলে দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করবে। “আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দেখাব। দুর্নীতি আজ আমাদের সমাজের গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষমতার দাপটে দুর্নীতিবাজরা আজ দেশ চালাচ্ছে। আমরা ইসলামি নীতির ভিত্তিতে একটি ন্যায্য সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করব, যেখানে বিচার হবে নিরপেক্ষ, এবং দুর্নীতিবাজদের কোনো রক্ষা থাকবে না।”
জামায়াত আমির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, “বাংলাদেশে গুম, খুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২৫ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতীক।”
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “বাংলাদেশ আজ এক অঘোষিত জরুরি অবস্থার ভেতরে চলছে। আমরা চাই, জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পরিস্থিতির প্রতি নজর দিক। রাষ্ট্রীয় দমননীতির শিকার হয়ে মানুষ আজ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামী ইউরোপ শাখার মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা, জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি ও সেভ বাংলাদেশ সংগঠনের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম, সিলেট মহানগর জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি সিরাজুল ইসলাম শাহীন এবং ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহীসহ আরও অনেকে। তারা সবাই একবাক্যে বলেন, বাংলাদেশের জনগণ পরিবর্তন চায়, আর সেই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি হলো গণভোট ও স্বচ্ছ নির্বাচন।
ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে গণভোট ছাড়া কোনো নির্বাচন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আমরা প্রবাসী জামায়াত নেতৃবৃন্দ চাই, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গড়ে উঠুক, যেখানে ইসলামি দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তি অংশগ্রহণ করতে পারে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্যে জামায়াত আবারও জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাচ্ছে— বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে দিতে চাইছে। অনেকেই মনে করেন, গণভোট ইস্যুটি এখন কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং আসন্ন নির্বাচনের বৈধতা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে, সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতারা জামায়াতের এই বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক প্রহসন’ বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলছেন, “যারা একসময় যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয় দিয়েছিল, তারা এখন গণতন্ত্রের মুখোশ পরে নতুন ষড়যন্ত্রের ফন্দি আঁটছে।” আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, “গণভোটের নামে তারা আসলে নির্বাচন ঠেকাতে চায়। জনগণ এখন সচেতন, তারা আর বিভ্রান্ত হবে না।”
তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, “দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সঠিক,” আবার কেউ বলছেন, “যে দল অতীতে সহিংস রাজনীতিতে জড়িত ছিল, তাদের কথায় আস্থা রাখা যায় না।”
বিশ্লেষক মহলে এই প্রশ্নও উঠেছে— জামায়াত কি সত্যিই গণতান্ত্রিক পথে ফিরে আসছে, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনের কৌশল? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম বলেন, “জামায়াত এখন নতুন রূপে নিজেদের উপস্থাপন করতে চাইছে। দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান এবং প্রবাসী ভোটাধিকার ইস্যু তাদের নতুন রাজনৈতিক কৌশল। তবে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা তাদের জন্য সহজ হবে না।”
সংবাদ সম্মেলনের শেষে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা বিভাজন চাই না, আমরা ঐক্য চাই। জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে কোনো স্বৈরশাসক টিকে থাকতে পারে না। ইসলাম শান্তির ধর্ম, আর আমাদের রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য। আমরা চাই, বাংলাদেশ হোক একটি ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক রাষ্ট্র।”
তার কণ্ঠে তখন আত্মবিশ্বাস ও আশার সুর। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্ধকারের মাঝেও তিনি যেন নতুন এক সম্ভাবনার কথা শুনিয়েছেন— একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ, যেখানে জনগণই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মালিক।