হানিফ ও ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ট্রাইব্যুনালের আদেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৯ বার
হানিফ ও ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ট্রাইব্যুনালের আদেশ

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ এবং জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বহু আলোচিত এই মামলার আদেশটি রবিবার (২ নভেম্বর) প্রদান করেন বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

এই মামলাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। কারণ, অভিযুক্ত দুইজনই দেশের রাজনীতিতে বহু দশক ধরে সক্রিয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, এবং তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল। ট্রাইব্যুনালের এই আদেশে সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

রায়ের আদেশে বলা হয়, মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হবে আগামী ২৫ নভেম্বর থেকে। ওইদিন মামলার সূচনা বক্তব্য এবং সাক্ষ্যগ্রহণের প্রথম দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। আদালত একইসঙ্গে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, কারণ মামলার সকল আসামি বর্তমানে পলাতক।

এই মামলায় মাহবুব উল আলম হানিফের পাশাপাশি আরও তিনজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা অভিযুক্ত হয়েছেন। তারা হলেন— কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা। আদালতের নথি অনুযায়ী, আসামিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালীন সময়ে কুষ্টিয়া অঞ্চলে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কুষ্টিয়া অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন এই আসামিরা। তারা মুক্তিকামী ছাত্রনেতা, শিক্ষক ও নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর নির্যাতন, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই ট্রাইব্যুনাল মামলাটি আমলে নিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছে।

এরইমধ্যে আদালত আসামিদের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) নিয়োগ দিয়েছে। তারা আদালতে আসামিদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করবেন। তবে আইনজীবী মহলে মতভেদ রয়েছে— কেউ কেউ মনে করেন, এ ধরনের মামলায় অনুপস্থিত আসামিদের বিচার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে হওয়া উচিত, অন্যথায় তা ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

এর আগে, চলতি বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে পৃথক একটি মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়। সেই মামলাটি ছিল কুষ্টিয়ার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে। তদন্তে উঠে আসে, ১৯৭১ সালে ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও স্থানীয় সংগঠকদের ওপর হামলা চালানো, কিছু মানুষকে আটক ও হত্যা করার ঘটনায় ইনুর সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, ইনু ও হানিফের মামলা পৃথকভাবে চলবে, কিন্তু অভিযোগের প্রেক্ষাপট প্রায় একই সময়কাল এবং একই অঞ্চলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ফলে দুটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ও সাক্ষ্যপ্রমাণে অনেক জায়গায় মিল রয়েছে।

অন্যদিকে, আজ (রবিবার) ট্রাইব্যুনালে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চানখারপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ১৩তম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছে আজ। এর আগে এই মামলায় ২০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তদন্ত সংস্থা জানায়, যুদ্ধ চলাকালে ঢাকার চানখারপুল এলাকায় মুক্তিকামী ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করছে। তবে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নতুন করে বিচার শুরুর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এনেছে ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা, তার নিরপেক্ষতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার গতিশীলতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মামলাগুলো শুধু ব্যক্তিগত দায় নয়, ইতিহাসের দায়ও বহন করছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচার বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রতীক, যা যুদ্ধের সময়কার নৃশংসতা ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতি সমাজের অবস্থানকে দৃঢ় করে।

হানিফ ও ইনুর বিরুদ্ধে এই বিচার প্রক্রিয়া এখন সবার নজরে। আগামী ২৫ নভেম্বর যখন আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে, তখন এ মামলাটি কেবল আইনি নয়, বরং রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে বলে ধারণা করছেন অনেকেই।

এই বিচার কেবল দুইজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে নয়, বরং যুদ্ধকালীন সময়ের অন্ধকার অধ্যায়ের সত্য উদঘাটনের আরেকটি ধাপ বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, দীর্ঘ ৫৪ বছর পরও এমন বিচার রাষ্ট্রের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার বার্তা বহন করে।

একইসঙ্গে, অভিযুক্তরা যদি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবে সেটিও হবে বিচারব্যবস্থার শক্তিমত্তার প্রমাণ— যেখানে সত্য, প্রমাণ ও আইনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে। সেই অপেক্ষাতেই এখন পুরো দেশ, বিশেষ করে কুষ্টিয়ার মানুষ তাকিয়ে আছে ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত