প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধপূর্ণ অবস্থানে থাকা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণভোট ইস্যু ঘিরে দুই দলের পারস্পরিক সমালোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির প্রতি কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেছেন, বিএনপি অতীতে জামায়াতের সমর্থন নিয়েই সরকার গঠন করেছিল, অথচ এখন সেই জামায়াতের বিরুদ্ধেই বিষোদগার করছে।
রোববার (২ নভেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারস্থ আল ফালাহ মিলনায়তনের চতুর্থ তলায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। দেশে চলমান রাজনৈতিক সংকট, গণভোট প্রসঙ্গ ও বিএনপির সাম্প্রতিক অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
ডা. তাহের তার বক্তব্যে বলেন, “বিএনপির এক নেতা এখন বলছে, জামায়াতে ইসলামীকে ব্যান করা হোক। আমি জানতে চাই, যদি আমাদের ব্যান করা হয়, তাহলে ১৯৯১ সালে বিএনপি কীভাবে সরকার গঠন করেছিল? তারা কি ভুলে গেছে যে, সেই নির্বাচনে জামায়াতের সমর্থনেই তারা ক্ষমতায় আসে?” তিনি আরও যোগ করেন, “বিএনপি এমন অনেক কথা বলছে যা সত্য হলে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেত।”
তিনি বলেন, “কোনো দল যদি মনে করে ক্ষমতায় গিয়ে চাঁদাবাজি করবে, সব দখল করবে, তাহলে সেখানে সততার কোনো স্থান নেই। জামায়াতে ইসলামী এমন দল নয়। আমরা কাউকে প্রতারণা করি না, কারও সঙ্গে মোনাফেকি করি না। আমাদের সঙ্গে যার আপত্তি, তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করতে আমরা সবসময় প্রস্তুত।”
জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা আরও বলেন, “বিএনপি যদি মনে করে আমাদের বাদ দিয়েই তারা রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পাবে, তাহলে সেটা ভুল ধারণা। এই দেশের রাজনীতি থেকে জামায়াতকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ আমরা জনগণের দল, আমরা নীতির রাজনীতি করি।”
গণভোটের ইস্যুতে বিএনপির বিরোধিতাকে সমালোচনা করে ডা. তাহের বলেন, “অনেকে বলছে গণভোটের খরচ বেশি হবে। আমি বলি, চাঁদাবাজির টাকায় ১ হাজার গণভোট করা সম্ভব। জাতির প্রয়োজনেই এখন গণভোটের সময় এসেছে। এটি কোনো অপচয় নয়, বরং জনগণের মতামত জানার গণতান্ত্রিক উপায়।”
তিনি আরও দাবি করেন, “গণভোটে অংশ নিলে বিএনপির ভরাডুবি ঘটবে। কারণ এই গণভোটে ৮০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবে, আর বিএনপির ‘না’ ভোট পড়বে মাত্র ২০ শতাংশ। তাই তারা এতে অংশ নিতে ভয় পাচ্ছে। তারা জানে, এর প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে।”
ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গেও তিনি বিএনপিকে লক্ষ্য করে সমালোচনামূলক বক্তব্য রাখেন। ডা. তাহের বলেন, “ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপি ভয় পাচ্ছে। তারা জানে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়, তাহলে ছাত্রশিবির জিতে যাবে। তাই তারা নির্বাচনে যেতে চায় না।”
তার বক্তব্যে বিএনপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সুবিধাবাদী মনোভাবের অভিযোগও উঠে আসে। তিনি বলেন, “যে দল একসময় আমাদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করেছে, আজ তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখতে আমাদেরই বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। এই দ্বিচারিতা জনগণ বুঝে ফেলেছে।”
বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও প্রকট হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে সম্প্রতি একাধিক নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন, যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দলের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং ভবিষ্যতেও তারা জামায়াতের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক জোটে যাবে না। এর পরপরই জামায়াতের শীর্ষ পর্যায় থেকে একের পর এক পাল্টা বক্তব্য আসছে।
ডা. তাহের এদিন বলেন, “বিএনপি ভুলে গেছে যে, সংকটের সময় আমরা সবসময় তাদের পাশে ছিলাম। দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা একসাথে আন্দোলন করেছি। আজ যখন জাতি সংকটে, তখনও আমরা আলোচনায় বসতে চাই। জাতির ভবিষ্যতের জন্য একসাথে বসে আলোচনার বিকল্প নেই।”
তিনি বিএনপির উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আগামীকালকের মধ্যেই তারা যেন আমাদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের ব্যাখ্যা দেয়। আমরা মুখোমুখি আলোচনায় যেতে প্রস্তুত। দেশের রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের জন্য এখন ঐক্যের সময়, বিভেদের নয়।”
সংবাদ সম্মেলনে ডা. তাহেরের বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল—জামায়াতে ইসলামী এখন রাজনৈতিকভাবে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তারা শুধু বিএনপির সমালোচনাই করেনি, বরং গণভোট ও জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ টেনে নিজেদের ইতিবাচক রাজনৈতিক অবস্থানও তুলে ধরেছে।
জামায়াতের এই অবস্থানকে বিশ্লেষকরা দেখছেন রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল এবং সম্ভাব্য নির্বাচনী রোডম্যাপ সামনে রেখে জামায়াত রাজনৈতিক সমীকরণে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। বিএনপির সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকলেও বাস্তব রাজনীতির প্রয়োজনে উভয় দলই এখন একে অপরের দূরত্বে অবস্থান করছে।
তবে ডা. তাহের সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন—“আমরা ঝগড়ায় যেতে চাই না। বিএনপি যতই উসকানি দিক, আমরা সংলাপ চাই, সংঘাত নয়। কারণ দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে শান্তিপূর্ণ সমাধানই হতে পারে একমাত্র পথ।”
তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, জামায়াত আপাতত সংঘাত নয়, বরং রাজনৈতিক আলোচনার পথেই এগোতে চায়। তবে বিএনপি তার জবাবে কী অবস্থান নেয়, সেটিই এখন রাজনীতির পরবর্তী আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ডা. তাহেরের এই বক্তব্য শুধু বিএনপির প্রতি প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি জামায়াতের পক্ষ থেকে একটি কৌশলগত বার্তা—দলটি এখনো সক্রিয়, প্রভাবশালী এবং দেশের রাজনীতিতে তার অবস্থান হারায়নি। এখন দেখা বাকি, এই বার্তা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিগুলো।