খুলনায় বিএনপি অফিসে বোমা ও গুলিবর্ষণ: মাদ্রাসা শিক্ষক নিহত, আহত তিন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭ বার
খুলনায় বিএনপি অফিসে বোমা ও গুলিবর্ষণ: মাদ্রাসা শিক্ষক নিহত, আহত তিন

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

খুলনার শান্ত শহর কুয়েট রোড এলাকা হঠাৎ রোববার রাতে পরিণত হয় আতঙ্কের নগরীতে। রাত ৯টার দিকে বিএনপি নেতার অফিসে সংঘটিত বোমা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ইমদাদুল হক নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষক। আহত হয়েছেন আরও তিনজন। পুলিশ বলছে, এটি ছিল পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা, আর স্থানীয়রা বলছেন—রাজনৈতিক উত্তেজনার রেশই এমন মর্মান্তিক ঘটনার জন্ম দিয়েছে।

নিহত ইমদাদুল হক ছিলেন বছিতলা নুরানি হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক। তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন, তিনি ছিলেন অতি বিনয়ী ও ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ। যে রাতে তিনি নিহত হন, সে রাতেও তিনি কোনো রাজনৈতিক সভায় ছিলেন না—বরং স্থানীয় এক ধর্মীয় মাহফিলের সহযোগিতার জন্য গিয়েছিলেন বিএনপি নেতা ও ইউপি সদস্য মামুন শেখের অফিসে। ঠিক সেই সময়ই ঘটে এই নৃশংস হামলা।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন যোগীপোল ইউনিয়ন বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক ও ইউপি সদস্য মামুন শেখ (৪৫), বেল্লাল খান (৫৫) এবং মিজানুর রহমান (৫৮)। তাদের মধ্যে মামুন ও বেল্লাল বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। কর্তব্যরত চিকিৎসকের ভাষায়, মামুন শেখের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাতের নীরবতা ভেঙে তিনটি মোটরসাইকেলে করে কয়েকজন যুবক অফিসের সামনে আসে। তারা এসে বিনা সতর্কতায় বোমা ও গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। মুহূর্তেই চারপাশ ধোঁয়ায় ঢেকে যায়, চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। স্থানীয়রা প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠান। কিন্তু ইমদাদুল হককে বাঁচানো যায়নি।

নিহতের ছেলে অনিক, যিনি খুলনা মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থী, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার বাবা কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। মাহফিলের টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। তিনি সবসময় বলতেন আমি যেন ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করি। এখন কীভাবে এই স্বপ্ন পূরণ করব?” এই কথাগুলো শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং একটি সমাজের হৃদয়বিদারক বাস্তবতার প্রতিফলন।

খানজাহান আলী থানা বিএনপি’র সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, “এটি ছিল সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা। মামুনকে লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিরীহ এক শিক্ষক প্রাণ হারিয়েছেন। আমাদের নেতা মামুন শেখ এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।”

খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তুহিনুজ্জামান জানান, “রাতে সংঘটিত হামলায় ইমদাদুল হক নামের এক শিক্ষক নিহত হয়েছেন। আরও তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আমরা ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি বোমার টুকরো এবং গুলির খোসা উদ্ধার করেছি। হামলাকারীদের শনাক্ত করতে ইতিমধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে।”

এদিকে, আড়ংঘাটা থানার ওসি খায়রুল বাসার বলেন, “মামুন শেখ প্রায় প্রতিদিন দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে তার অফিসে বসতেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে এই হামলা চালানো হয়েছে। আমরা হামলাকারীদের শনাক্তে কাজ করছি।”

ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাতভর কুয়েট রোড ও আশপাশের এলাকায় টহল জোরদার করে পুলিশ। স্থানীয়রা জানায়, হামলার পর থেকেই বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল দ্রুতগতি নিয়ে এলাকা ত্যাগ করতে দেখা গেছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের কাজও শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এমন নৃশংস ঘটনার পর খুলনার সাধারণ মানুষ গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “এখানে আগে কখনও এমন ঘটনা ঘটেনি। রাজনীতি যতই থাকুক, মানুষ হত্যা কোনো সমাধান নয়। একজন শিক্ষককে বোমা ও গুলিতে হত্যা—এটা আমাদের সমাজের জন্য বড় লজ্জা।”

মাদ্রাসা শিক্ষক ইমদাদুল হকের মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “স্যার ছিলেন আমাদের অভিভাবক। যেকোনো বিপদে তিনি পাশে দাঁড়াতেন। এমন একজন মানুষকে আমরা হারালাম, যিনি আমাদের শেখাতেন শান্তি ও মানবতার শিক্ষা।”

এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা মনে করছেন, প্রশাসন যদি দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় না আনে, তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বেড়ে যেতে পারে।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই হামলার পেছনে কারা আছে তা আমরা জানার চেষ্টা করছি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের একটি অংশ। তবে কোনো নিরীহ নাগরিক যেন এমন সহিংসতার বলি না হন, সেটিই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”

ইমদাদুল হকের মৃত্যু শুধু একটি পরিবার নয়, বরং একটি সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। খুলনার মতো শান্ত শহরে যখন ধর্মীয় কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়া একজন শিক্ষক সন্ত্রাসের শিকার হন, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমাদের নিরাপত্তা, মানবতা ও ন্যায়বিচার কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

ঘটনার পর দিনভর এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। স্থানীয় মসজিদে তার জন্য দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। তার সহকর্মী শিক্ষকরা বলেন, “ইমদাদুল স্যার ছিলেন একজন সৎ ও নির্লোভ মানুষ। তার মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”

বর্তমানে খুলনা মহানগর পুলিশ, সিআইডি ও ডিবি যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। তারা বলেছে, হামলাকারীরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, আইনের আওতায় আনা হবে।

খুলনার কুয়েট রোডের এই রক্তাক্ত রাত তাই শুধু একটি সহিংস ঘটনার খবর নয়, এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অমানবিকতার এক নির্মম উদাহরণ। নিহত শিক্ষক ইমদাদুল হকের পরিবার এখন ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। তাদের মুখে একটাই প্রশ্ন—একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে রাজনীতি কবে শান্ত হবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত