প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব মুসলিম সমাজে প্রভাব বিস্তারকারী শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের মধ্যে আবারও জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জর্ডানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘দ্য রয়েল ইসলামিক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার (আরআইএসএসসি)’ সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ২০২৬ সালের বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ৫০০ মুসলিম ব্যক্তিত্বের তালিকা — “দ্য মুসলিম ৫০০: দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ইনফ্লুয়েনশিয়াল মুসলিমস ২০২৬” — যেখানে ৫০তম স্থানে রয়েছেন বাংলাদেশের এই নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ।
এই তালিকাটি প্রণয়ন করা হয় বিশ্বের মুসলিম সমাজে ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক ক্ষেত্রে যেসব ব্যক্তিত্ব গভীর প্রভাব ফেলছেন তাদের অবদানের ভিত্তিতে। এ বছরও ড. ইউনূসকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তার মানবিক কর্মকাণ্ড, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভাবনায় অসাধারণ অবদান, এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে তার ভূমিকার জন্য। প্রতিবেদনে তাকে “Interim Prime Minister of Bangladesh” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা তার বর্তমান অবস্থান ও আন্তর্জাতিক প্রভাবকে আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত করে।
‘দ্য মুসলিম ৫০০’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি, যিনি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিবেচিত। দ্বিতীয় স্থানে আছেন পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদ মুফতি তাকি উসমানি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী ফিকহ ও অর্থনীতি নিয়ে কাজ করছেন। তৃতীয় স্থানে রয়েছেন ইয়েমেনের সুফি আলেম শেখ হাবিব উমর বিন হাফিজ, যিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও মানবিক বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন সারা বিশ্বে।
শীর্ষ দশে রয়েছেন আরও অনেক প্রভাবশালী নেতা ও চিন্তাবিদ—ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি, জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ দ্বিতীয়, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড শেখ ড. আহমদ আল-তায়্যিব, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান, সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।
তালিকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ, ইরাকের আয়াতুল্লাহ আল-সিস্তানি, সৌদি শিক্ষাবিদ শেখ সালমান আল-আওদা, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো, ভারতের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা মাহমুদ মাদানী, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, পাকিস্তানের মাওলানা তারিক জামিল, যুক্তরাজ্যের অধ্যাপক ড. টিমোথি উইন্টার (শেখ আবদাল হাকিম মুরাদ), ফুটবলার মোহাম্মদ সালাহ এবং আফগান তালিবান নেতা মোল্লা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা।
এই বিশাল তালিকার ৫০তম স্থানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে স্থান পেয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত বছরও তিনি একই অবস্থানে ছিলেন। এটি শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের জন্যও এক অনন্য মর্যাদার প্রতীক। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ড. ইউনূসের নেতৃত্ব, তার অর্থনৈতিক উদ্ভাবন, এবং সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে বিশ্বব্যাপী তার অবদান তাকে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।
‘দ্য রয়েল ইসলামিক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার’ এই তালিকাটি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালাল সেন্টার ফর মুসলিম-ক্রিশ্চিয়ান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’-এর সহযোগিতায়। প্রতিবছরের মতো এবারও গবেষকরা বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী মুসলিমদের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে এই তালিকা প্রণয়ন করেছেন।
অধ্যাপক ইউনূসের জীবন ও কর্মযাত্রা এই স্বীকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৪০ সালের ২৮ জুন চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া এই অর্থনীতিবিদ যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি অর্জনের পর দেশে ফিরে এসে শিক্ষকতা শুরু করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকেই তার উদ্ভাবনী চিন্তার যাত্রা শুরু। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন গ্রামীণ ব্যাংক, যা জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে লাখো দরিদ্র নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলে।
২০০৬ সালে এই অবদানের জন্য তিনি ও তার প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। তারপর থেকে ড. ইউনূসের নাম শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। তার তৈরি মডেল এখন আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এমনকি ইউরোপ-আমেরিকাতেও সামাজিক ব্যবসার অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে যখন শেখ হাসিনা সরকার পতন হয়, তখন দেশের স্থিতিশীলতা ফেরাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. ইউনূস। দেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার এই সময়টিতে তার নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আলোচিত হয়েছে। তার এই ভূমিকা ‘দ্য মুসলিম ৫০০’ তালিকায় তার অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে ড. ইউনূস শুধু একজন নোবেলজয়ী নন, বরং অনুপ্রেরণার প্রতীক। ক্ষুদ্রঋণ থেকে সামাজিক ব্যবসা—তার ভাবনা আজ বৈশ্বিক উন্নয়নের এক নতুন দর্শন হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের প্রভাবশালী মুসলিমদের তালিকায় তার অন্তর্ভুক্তি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও উজ্জ্বল করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারহানা ইসলাম বলেন, “ড. ইউনূসের এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্বে এখনও ইতিবাচকভাবে আলোচিত হচ্ছে। তিনি দেখিয়েছেন, মানবিকতা ও উদ্ভাবনী চিন্তা একসঙ্গে চললে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব।”
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ড. ইউনূসের এই অর্জন নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই বলেছেন, বিশ্বে যখন মুসলিম সমাজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন বাংলাদেশের এক নাগরিকের এমন স্বীকৃতি গৌরবের বিষয়।
প্রভাবশালী মুসলিমদের এই তালিকা কেবল ক্ষমতা বা পদমর্যাদার পরিমাপ নয়—এটি আসলে সেইসব ব্যক্তিদের স্বীকৃতি, যারা মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। আর এই ক্ষেত্রেই অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা অনন্য। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন প্রমাণ করে—পরিবর্তন আনতে হলে শুধু অর্থ নয়, প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, সাহস এবং অবিচল বিশ্বাস।
বিশ্বের কোটি মানুষের জীবনে আলো ছড়িয়ে যাওয়া এই মানুষটি আজও প্রমাণ করছেন, আদর্শ ও মানবিকতার শক্তি রাজনীতি কিংবা অর্থনীতির সীমা ছাড়িয়ে একটি জাতিকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ তাই গর্ব করে বলতে পারে—প্রভাবশালী মুসলিমদের তালিকায় আবারও তাদের এক সন্তান, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সত্যিকারের নেতৃত্ব কাকে বলে।










