প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সহিংসতা ও জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের চার নেতাকে বহিষ্কার করেছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সংঘটিত এ সহিংসতার পরই দলটির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে দ্রুত এই সিদ্ধান্ত আসে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সোমবার (৩ নভেম্বর) দিবাগত রাতে এই বহিষ্কারাদেশ ঘোষণা করা হয়। বহিষ্কৃতদের মধ্যে রয়েছেন— সেচ্ছাসেবক দলের সীতাকুণ্ড উপজেলা সভাপতি আলাউদ্দিন মনি, সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন বাবর, সীতাকুণ্ড পৌরসভার আহ্বায়ক মামুন, এবং যুবদলের সোনাইছড়ী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মমিন উদ্দিন মিন্টু।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সোমবার সন্ধ্যার পর দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম উত্তর জেলাধীন সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কদমরসুল, ভাটিয়ারী বাজার ও জলিল গেট এলাকায় সহিংসতা, হানাহানি এবং রাস্তা অবরোধের মতো ঘটনা ঘটেছে। এতে সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয় এবং যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এসব কর্মকাণ্ডকে দলীয় শৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘন ও জনস্বার্থবিরোধী হিসেবে অভিহিত করে চার নেতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে পাঠানো ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এই চারজনকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় নীতি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
চট্টগ্রামের স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি সীতাকুণ্ডে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। একাধিক প্রার্থী নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এতে কিছুদিন ধরে দলীয় কর্মীদের মধ্যে অঘোষিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সোমবার সন্ধ্যার দিকে স্থানীয় বাজার ও মহাসড়কের কয়েকটি পয়েন্টে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ হস্তক্ষেপ করলে সংঘর্ষ আরও উত্তপ্ত হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
দলীয় মনোনয়নকে ঘিরে এমন সহিংসতার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। তারা বলেছেন, দল বর্তমানে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাই এমন সময়ে শৃঙ্খলাভঙ্গ বা অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। কেন্দ্রীয় কমিটির এক সদস্য বলেন, “দলের ভেতরে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা বা ব্যক্তিগত স্বার্থে সহিংসতা কখনোই মেনে নেওয়া হবে না। বিএনপি গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে বিশ্বাসী, তাই যারা সেই চেতনার বিরুদ্ধে কাজ করবে, তাদের জায়গা এই দলে নেই।”
বহিষ্কৃত নেতাদের সবাই স্থানীয়ভাবে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক মহলে বলা হচ্ছে, আসলাম চৌধুরীর প্রভাবাধীন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় মনোনয়নকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন চলছে। কেন্দ্রীয় কমিটি এবারের প্রার্থী নির্বাচনে তৃণমূল পর্যায়ের মতামত বিবেচনায় নিচ্ছে বলে জানা গেছে, কিন্তু তাতে স্থানীয় গোষ্ঠীগত প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী বহিষ্কারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেও, কিছুজন অভিযোগ তুলেছেন যে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিষয়টি আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান না করেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁদের দাবি, ঘটনাটির পেছনে ছিল পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি ও স্থানীয় প্রতিপক্ষের উসকানি। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় বলছে, দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে বিএনপির এই কঠোর শৃঙ্খলাবিধানমূলক সিদ্ধান্ত দলটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন জেলায় দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিরোধের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তারা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রক্রিয়া যতই স্বচ্ছ হবে, ততই বিএনপি তার সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন করতে পারবে।
চট্টগ্রামের স্থানীয়দের অনেকেই সহিংসতার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, রাজনীতি মানে জনগণের কল্যাণে কাজ করা, কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে। স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, “রাতের দিকে হঠাৎ রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, যানবাহন আটকে পড়ে, সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। রাজনীতি যদি মানুষের কষ্ট বাড়ায়, তাহলে সেটা কেমন রাজনীতি?”
বহিষ্কৃতদের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন কর্মী দাবি করেছেন, তারা দলের সিদ্ধান্ত মেনে চলবেন এবং কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে ব্যাখ্যা দাখিল করবেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপি যদি আগামী নির্বাচনে শক্ত অবস্থান নিতে চায়, তবে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও শৃঙ্খলা রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বহিষ্কৃতদের ঘটনাটি সেই পরীক্ষারই একটি প্রতিফলন।
বর্তমানে বিএনপি বিভিন্ন জেলায় প্রার্থী চূড়ান্তকরণের কাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। দলের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া বজায় রেখে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর মধ্যেই সীতাকুণ্ডের এই ঘটনাটি দলীয় নেতৃত্বের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে।
দলীয় নেতারা আশাবাদী যে, এই পদক্ষেপ অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যতে কেউ যেন দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে সাহস না পায়।
রাজনৈতিক উত্তাপের এই সময়ে বিএনপির এই শৃঙ্খলাপরায়ণ সিদ্ধান্ত শুধু একটি দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও একটি বার্তা বয়ে আনে—সহিংসতা নয়, শৃঙ্খলাই রাজনীতির মূল শক্তি।