প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে দায়ের করা আপিলের সপ্তম দিনের শুনানি শুরু হয়েছে। এ মামলাটি এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিতর্ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) সকালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এ শুনানি শুরু হয়। বিএনপির পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন আজকের শুনানিতে অংশ নেন।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সমন্বয়ে গঠিত এই বেঞ্চের সামনে আদালতকক্ষে উপস্থিত ছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধি। শুনানি শুরু হতেই আদালতের পরিবেশে গভীর মনোযোগ ও গুরুত্ব লক্ষ করা যায়। বিএনপির পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে বলেন, দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণ হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়। সেই রায়ের পর থেকে নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের আস্থা হারিয়েছে।
অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন আদালতে বলেন, “২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। জনগণ এখনো বিশ্বাস করে, একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব।” তিনি যুক্তি দেন, সংবিধানের ৫৮(বি) থেকে ৫৮(ডি) অনুচ্ছেদে যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ছিল, তা জনগণের ভোটাধিকার রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল।
এ সময় আপিল বেঞ্চের বিচারপতিরা আইনজীবীর বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বিভিন্ন প্রশ্ন তোলেন। আদালতের এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আদালতের রায়ের মাধ্যমে বাতিল হয়েছিল, কিন্তু তার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতি কীভাবে পরিবর্তিত হলো, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।”
বিএনপির আইনজীবী দল আদালতকে স্মরণ করিয়ে দেন, পূর্ববর্তী নির্বাচনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাই হতে পারে একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান।
এর আগে, ষষ্ঠ দিনের শুনানিতে বিএনপির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনকারী আইনজীবীরা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের রায় দেওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান বিভাজন ও সংঘাত তৈরি হয়েছে। তাঁরা বলেন, “গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করতে হলে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের বিকল্প নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারই দেশের রাজনীতিকে সুষ্ঠু পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।”
একই ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সংগঠনের পক্ষ থেকেও আদালতে শুনানি হয়েছে। তাঁরা পৃথকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের পক্ষে সাংবিধানিক ও জনআস্থাভিত্তিক যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।
উল্লেখ্য, গত ২৭ আগস্ট সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন মঞ্জুর করেন এবং আপিলের অনুমতি দেন। এ সময় আদালত বলেন, “এই বিষয়টি জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই পূর্ণাঙ্গ শুনানি প্রয়োজন।” এরপর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার, নাগরিক সংগঠন সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন আবেদনকারী আপিল করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আদালতের এ দীর্ঘ শুনানি এখন দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশক হয়ে উঠেছে। আদালত কক্ষে প্রতিদিনই উপস্থিত থাকছেন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এবং সাধারণ নাগরিকরা। অনেকের মতে, এই মামলার রায় দেশের পরবর্তী নির্বাচনের চরিত্র নির্ধারণ করবে।
এদিকে ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করেন। সেই রায়ের পর থেকেই দেশে নির্বাচনকালীন সরকারের গঠন ও দায়িত্ব নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়, যা আজও সমাধান পায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি থাকলেও, জনগণের মধ্যে একটি স্বচ্ছ নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি বরাবরই শক্তিশালী ছিল। তাঁরা মনে করছেন, বর্তমানে আদালতে চলমান এই শুনানি শুধু একটি সাংবিধানিক বিষয় নয়, বরং এটি জাতির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো মনে করছে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে। দলটির এক শীর্ষস্থানীয় নেতা সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা আদালতের প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখছি। এই মামলার রায় গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।”
অন্যদিকে, সরকারপন্থী আইনজীবীরা শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফেরানো হলে তা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তাঁদের মতে, নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব, কোনো অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নয়।
সুপ্রিম কোর্টে এখন যে যুক্তি-প্রতিযুক্তি চলছে, তা দেশের বিচারিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। প্রতিদিনই আদালতের বারান্দা ও প্রাঙ্গণে সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক কর্মীদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। তাদের অনেকেই মনে করছেন, এই রায়ের ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ভারসাম্য, এমনকি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও।
আজকের সপ্তম দিনের শুনানিতে আদালত আগামী অধিবেশনে আরও কয়েকজন আইনজীবীর বক্তব্য শোনার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিরা তাঁদের মতামত দেবেন। আপিল বিভাগের বেঞ্চ ইঙ্গিত দিয়েছে যে, শুনানি শেষ হওয়ার পর রায় সংরক্ষণ করা হবে এবং যথাসময়ে তা প্রকাশ করা হবে।
বিচার বিভাগের এই চলমান প্রক্রিয়াকে অনেকে ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্মূল্যায়নের অধ্যায়’ বলে উল্লেখ করছেন। দেশের মানুষ এখন অপেক্ষা করছে—তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হবে কি না, নাকি আদালত পূর্ববর্তী রায়ই বহাল রাখবে।
সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলা হয়েছে, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের এই শুনানি সেই ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই রায় শুধু একটি সাংবিধানিক প্রশ্নের জবাব দেবে না, বরং তা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও।