প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট আবারও বড় পরিবর্তনের পথে। জাতীয় দলের কোচিং প্যানেলে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছেন দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান হলেও বিতর্কিত তারকা—মোহাম্মদ আশরাফুল। বিসিবির সর্বশেষ বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, জাতীয় দলের নতুন ব্যাটিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব পাবেন তিনি। আসন্ন আয়ারল্যান্ড সিরিজ থেকেই শুরু হবে তার নতুন অধ্যায়।
এক সময় মাঠে ব্যাট হাতে কোটি সমর্থকের হৃদয়ে ঝড় তোলা আশরাফুল এবার নামছেন নতুন ভূমিকায়। আর এই নিয়োগের মধ্য দিয়েই প্রশ্নটা আবারও জোরালো—তাহলে কি মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এখন জাতীয় দলের ‘ওএসডি’?
যে সালাউদ্দিন গত দেড় বছর ধরে দলের সিনিয়র সহকারী কোচ হিসেবে মূলত ব্যাটিং কোচের ভূমিকা পালন করে আসছিলেন, তিনি হঠাৎই যেন কোচিং প্যানেলের প্রান্তসীমানায়। ক্রিকেটমহলে আলোচনা—ড্রেসিংরুমে তার প্রভাব নাকি কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তই আসলে বিসিবির মূল উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে আশরাফুল নামটি আবেগের। তিনি একদিন দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ, প্রতিভার বিস্ফোরণ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরি করা বিস্ময় বালক। কিন্তু পরবর্তীকালে ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারি তাকে নিয়ে যায় অন্ধকারে। নিষেধাজ্ঞা শেষে তিনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন কোচিংয়ে এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে।
সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন কোচিং কোর্স, এনসিএল-এ বরিশালের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তরুণদের সঙ্গে কাজ করে তার কোচিং দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এখন সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছেন জাতীয় দলে।
আশরাফুল নিজে বলেছেন, তিনি প্রস্তুত এবং তিনি বিশ্বাস করেন দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্কই তাকে সাহায্য করবে। এক সাক্ষাৎকারে আনন্দ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, তিনি প্রত্যেক কোচ ও খেলোয়াড়ের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী এবং এখানে কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
এ প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে আলোচিত। সালাউদ্দিন ছিলেন ব্যাটিং ইউনিটের ‘অঘোষিত নেতৃত্বে’। হেড কোচকে সহায়তার পাশাপাশি ব্যাটিং বিভাগে চাপের সময়ে তার কাঁধেই দায়িত্ব পড়ত। কিন্তু গত কয়েকটি সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ধারাবাহিক ব্যর্থতার পর প্রশ্ন উঠতে শুরু করে তার কোচিং-কার্যকারিতা নিয়ে।
একদিকে দলের ব্যাটিং সংকট, অন্যদিকে ড্রেসিংরুমে তার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলে তিনি যেন ধীরে ধীরে পেছনের সারিতে। জানা গেছে, দলের কয়েকজন ক্রিকেটারকে ঘিরে তার পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ছিল অভ্যন্তরে। বিকেএসপি-কেন্দ্রীক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টাও নাকি বিরক্ত করেছিল বোর্ডের কিছু পরিচালককে।
বোর্ডের কয়েকজন পরিচালক অফ দ্য রেকর্ড জানিয়েছেন, জাতীয় দলের মতো জায়গায় কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই। ব্যাটিং বিভাগে নতুন ভাবনা আনতেই তাই আশরাফুলকে নেওয়া হয়েছে।
তবে বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে, সিদ্ধান্তটি শুধুই আগ্রহী এবং যোগ্য একজন নতুন কোচকে যুক্ত করার অংশ। তারা দাবি করছে, সালাউদ্দিনের ব্যর্থতার কারণে নয়, বরং ব্যাটিং ইউনিটের উন্নতি ও বৈচিত্র আনতেই আশরাফুলকে নির্বাচন।
কিন্তু ক্রিকেট অঙ্গনের প্রবল স্পন্দনে উঠে আসা প্রশ্ন—তাহলে কি সালাউদ্দিন এখন মূলত নামমাত্র দায়িত্বে? সরকারি দপ্তরে যেমন কাউকে ‘দায়িত্বহীন পদে’ রেখে দেওয়া হয়, ক্রিকেট বোর্ডেও কি সালাউদ্দিন তেমন অবস্থায়?
এমনই শোরগোল চলছে ভেতরে-বাইরে।
একসময় খেলোয়াড়দের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার জন্য প্রশংসিত সালাউদ্দিন, এখন প্রশ্নের মুখে। ড্রেসিংরুমের আবহাওয়া ও সম্পর্কের সমীকরণ নাকি বোর্ডকে ভাবিয়েছে।
ক্রিকেট হলো শুধু স্কিল ও পরিকল্পনার খেলা নয়; এটি মানসিকতা ও পরিবেশের বিজ্ঞানও। এবং পেশাদার ক্রিকেটে কখনও পরিবর্তন ধীরে আসে, কখনও তা আকস্মিক। সালাউদ্দিনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টি ঘটেছে বলেই মনে করছেন অনেকে।
তবে বড় মাপের পেশাদার হিসেবে সালাউদ্দিনও নীরব থাকছেন না। গুঞ্জন আছে তিনি নিজেও দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ভেতরে ভেতরে। পাশাপাশি তার ঘনিষ্ঠ মহলে বলেছেন, তিনি বরাবরই চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন, এবং তার পথচলা এখানেই থেমে নেই।
নতুন ব্যাটিং কোচ, পুরনো সহকারী কোচ—কিন্তু সম্পর্কের নতুন সমীকরণ।
আয়ারল্যান্ড সিরিজই হবে এই পরিবর্তনের প্রথম পরীক্ষা। দলের ব্যাটারা এখনো লড়াই করছে ধারাবাহিকতার সঙ্গে। এমন সময়ে আশরাফুলের দায়িত্ব কঠিন। একদিকে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ফেরানো, অন্যদিকে কৌশলগত সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখা—সব মিলিয়ে তার সামনে বড় মিশন।
অন্যদিকে সালাউদ্দিনের সামনে এখন নিজেকে প্রমাণ করার নতুন চ্যালেঞ্জ। হয়তো পর্দার আড়ালে, তবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। অনেকেই বলছেন, তাকে প্রান্তে সরিয়ে রাখা হলেও তার অভিজ্ঞতা ও ক্রিকেট জ্ঞান এখনও অমূল্য।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। খেলোয়াড় বদলায়, কোচ বদলায়, কাঠামোও বদলায়। কিন্তু প্রতিবারই সমর্থকদের চোখ থাকে এক জায়গায়—ফলাফল।
এই পরিবর্তন ফল দেবে, নাকি বিভাজন সৃষ্টি করবে?
আশরাফুলের নতুন যাত্রা কতটা সফল হবে?
আর সালাউদ্দিনের অধ্যায় কি সত্যিই “ওএসডি”র কোটায় ঢুকে যাচ্ছে, নাকি আরেকটি প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখতে চলেছেন তিনি?
সময়ের অপেক্ষা।
তবে এটুকু নিশ্চিত—বাংলাদেশ ক্রিকেটের ড্রেসিংরুমে এক নতুন বাতাস বইতে শুরু করেছে। এই হাওয়া ঝড় তুলবে, নাকি শীতল প্রশান্তি দেবে, তা দেখবে পুরো দেশ।