প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে বিএনপির মনোনয়নকে ঘিরে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনায় আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে আক্কেলপুর উপজেলা শহরে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা বিরাজ করছে, এবং পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা এবং সদ্য মনোনীত প্রার্থী সাবেক ডিসি ও সচিব আব্দুল বারীর সমর্থকদের মধ্যে। সকালে গোলাম মোস্তফার সমর্থকরা আক্কেলপুর উপজেলা পরিষদ এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তাঁরা দাবি করেন, প্রকৃত নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে এবং স্থানীয় জনসমর্থন বিবেচনা না করেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ সময় তারা “মনোনয়ন বাণিজ্য” ও “বঞ্চিত প্রার্থীর ন্যায্য দাবি” সংক্রান্ত স্লোগান দেন।
চোখের পলকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন আব্দুল বারীর সমর্থকরা সেখানে উপস্থিত হন। তাঁরা মিছিল নিয়ে উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রবেশ করে এবং গোলাম মোস্তফা সমর্থকদের বিক্ষোভকে “দলবিরোধী কার্যক্রম” বলে আখ্যায়িত করেন। দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা অল্প সময়ের মধ্যেই ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়ায় রূপ নেয়। স্থানীয়রা জানান, প্রথমে লাঠি ও বাঁশ নিয়ে উভয় পক্ষ একে অপরকে লক্ষ্য করে আক্রমণ শুরু করে। এতে অন্তত দুজন গুরুতর আহত হন, যাদের মধ্যে একজনকে জয়পুরহাট আধুনিক জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনিসুর রহমান বলেন, “দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে সেখানে যাই। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে, তবে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে নতুন করে কোনো উত্তেজনা না ছড়ায়।” তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি, তবে তদন্ত চলছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জয়পুরহাট জেলার বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে, যা কেন্দ্রীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ার সময় আরও প্রকাশ্যে আসে। ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে দলের সক্রিয় সংগঠক হিসেবে পরিচিত। তাঁর সমর্থকদের অভিযোগ, স্থানীয় জনভিত্তি ও সংগঠনের দীর্ঘ অবদান থাকা সত্ত্বেও তাঁকে উপেক্ষা করে হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে একজন প্রাক্তন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে প্রার্থী করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে তাঁরা দলের তৃণমূলের প্রতি “অবমূল্যায়ন” হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, আব্দুল বারীর সমর্থকদের দাবি, তিনি একজন পরিষ্কার ভাবমূর্তির প্রার্থী, যিনি প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দলকে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন। তাঁরা মনে করেন, গোলাম মোস্তফার সমর্থকরা মনোনয়ন না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই উত্তেজনা সৃষ্টি করছেন। সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষই নিজেদের যুক্তিকে জোরালোভাবে তুলে ধরে একে অপরের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ তোলেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের সময় আক্কেলপুর বাজারের দোকানপাট দ্রুত বন্ধ হয়ে যায় এবং জনসাধারণ আতঙ্কে দিকবিদিক ছুটতে থাকে। প্রায় আধা ঘণ্টার মতো এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করতে হস্তক্ষেপ না করলে ঘটনা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারত।
জেলা বিএনপির সভাপতি এই ঘটনার পর গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা বিষয়টি জানি এবং দুঃখ প্রকাশ করছি। দলের ভেতরে এ ধরনের সংঘর্ষ কোনোভাবেই কাম্য নয়। যারা এই বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে তিনি এও উল্লেখ করেন, “মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, তবুও তৃণমূলের অনুভূতিও আমাদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।”
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ বলছেন, বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ বিরোধ আসন্ন নির্বাচনে দলের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আক্কেলপুরের স্থানীয় ভোটার শামসুল আলম বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম বিএনপি এবার ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে। কিন্তু নিজেরা নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করলে জনগণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে।”
এদিকে, ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা একে অপরকে দায়ী করে পোস্ট ও ভিডিও শেয়ার করতে থাকেন। কিছু ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, উভয় পক্ষের সমর্থকরা লাঠিসোটা হাতে একে অপরকে তাড়া করছে, এবং এলাকাজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এসব ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মনোনয়ন নিয়ে দলের ভেতরে এই ধরনের সংঘর্ষ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপির জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। কেন্দ্রীয়ভাবে দল ঐক্য ও শৃঙ্খলার বার্তা দিলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা শুধু দলের সাংগঠনিক কাঠামোকেই দুর্বল করবে না, বরং ভোটারদের আস্থাও নষ্ট করবে।
দিনের শেষদিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন উপজেলা শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টহল জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে থাকলেও উভয় পক্ষের ওপর নজর রাখা হচ্ছে যাতে পুনরায় কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে।
বিএনপির স্থানীয় নেতারা বলছেন, তারা এখনো কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তবে দলের ভেতরে অবিচার হলে তা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অধিকার তাদের আছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় নেতারা জোর দিচ্ছেন দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর।
আক্কেলপুরের এই ঘটনা শুধু স্থানীয় রাজনীতিতেই নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির চিত্রেও নতুন করে এক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে—যেখানে মনোনয়ন এখন কেবল রাজনীতির প্রশ্ন নয়, বরং মর্যাদা, প্রভাব এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।