প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
পাকিস্তান ও আফগানিস্তান বৃহস্পতিবার আবারও শান্তি আলোচনায় বসছে। দুই দেশই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। গত মাসে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর সীমান্তে সংঘটিত ভয়াবহ সংঘর্ষে ডজনখানেক মানুষ নিহত হওয়ায় পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত। এই সংঘর্ষটি ২০২১ সালে তালেবান কাবুলের ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে সীমান্তে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুই দেশ গত ১৯ অক্টোবর দোহায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। তবে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার আলোচনায় পাকিস্তানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি নিয়ে মতবিরোধের কারণে কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব হয়নি। এবার নতুন বৈঠকে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের জন্য আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা আশা করি বুদ্ধিমত্তা প্রাধান্য পাবে এবং অঞ্চলে শান্তি ফিরবে।” তিনি আরও জানান, ইসলামাবাদ একমাত্র লক্ষ্য নিয়ে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে—আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে সক্রিয় পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে তালেবান সরকারকে রাজি করানো।
সরকারি সূত্র জানায়, পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন দেশটির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর প্রধান আসিম মালিক। অপরদিকে, আফগানিস্তানের গোয়েন্দা প্রধান আবদুল হক ওয়াসিক তালেবান সরকারের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন, এমন তথ্য জানিয়েছেন তালেবান মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরটিএ-কে।
পাকিস্তান ও আফগান তালেবান বহু বছর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা দ্রুত অবনতি ঘটেছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করেছে, তালেবান সরকার পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি)-এর সদস্যদের আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত। কাবুল এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, তারা এই গোষ্ঠীর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে না।
অক্টোবরের সংঘর্ষ শুরু হয় পাকিস্তানের বিমান হামলার পর, যা কাবুলসহ বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত হয় টিটিপির শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে। জবাবে আফগান তালেবান ২,৬০০ কিলোমিটার (১,৬০০ মাইল) সীমান্ত জুড়ে পাকিস্তানি সামরিক পোস্টে পাল্টা হামলা চালায়, ফলে বাণিজ্যিক রুটও বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধবিরতির সময়েও দুই দেশের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা অব্যাহত থাকে।
দোহা যুদ্ধবিরতির পরও সীমান্তে রক্তপাত বন্ধ হয়নি। তাই ইস্তাম্বুলের আলোচনায় দুই দেশের জন্য স্থায়ী শান্তি স্থাপনের চেষ্টা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বৈঠকে মূলত আলোচনা হবে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সন্ত্রাস ও সহিংসতা কমানো, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সমন্বয় এবং দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলো নিয়ে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইস্তাম্বুলে পুনরায় বসানো শান্তি আলোচনা কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলেন, “যদি পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সফলভাবে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি স্থাপন করতে পারে, তা না শুধু সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে, বরং উভয় দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের জন্যও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
উল্লেখ্য, সীমান্তে সংঘটিত সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও হানাহানির প্রেক্ষিতে সাধারণ জনগণের মধ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফেরানোর চাপে বৈঠকের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নেতৃত্ব এই আলোচনাকে কূটনৈতিকভাবে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সচেষ্ট। তারা উভয়পক্ষের মধ্যে আস্থা পুনঃস্থাপনের পাশাপাশি উভয় দেশের নাগরিকদের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ইস্তাম্বুল আলোচনার ফলাফল শুধু দুই দেশের সীমান্ত সমস্যার সমাধান করবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম কমানো এবং সীমান্ত অঞ্চলে বাণিজ্য ও চলাচল স্বাভাবিক করা এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য।
আসন্ন বৈঠকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান দুই দেশের গোয়েন্দা প্রধান এবং কূটনীতিকরা অংশগ্রহণ করবেন। তারা আশা করছেন, আলোচনায় কার্যকর সমঝোতা গড়ে উঠলে পূর্ববর্তী সংঘর্ষজনিত সমস্যাগুলো চূড়ান্তভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে। এছাড়া উভয় দেশই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পাচ্ছে, যা শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ জনগণও আলোচনার দিকে নজর রাখছে। সীমান্তে রক্তপাত বন্ধ এবং সন্ত্রাস কমানোর আশা মানুষের মধ্যে শান্তির প্রত্যাশা জাগিয়েছে। ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত এই নতুন দফার বৈঠক দুই দেশের জন্য এক সম্ভাবনাময় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা আগামী মাসগুলোতে অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা পুনঃস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।