ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল: বরগুনা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে নতুন ভয়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৩ বার

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ যেন থামছেই না। রাজধানী ঢাকায় যেমন হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর চাপ, তেমনি মফস্বলেও ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে এই প্রাণঘাতী রোগ। বিশেষ করে বরগুনা জেলায় পরিস্থিতি এখন এক ভয়ানক চিত্র ধারণ করেছে। গত আট মাসে সেখানে ৯ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৬৫ জনের। মৃত্যুর এই সংখ্যা ও আক্রান্তের হার অন্য সব জেলার তুলনায় অনেক বেশি, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় সতর্ক সংকেত।

বরগুনার মতো তুলনামূলক ছোট জেলায় এত বিপুল সংখ্যক রোগী ও মৃত্যু শুধুমাত্র পরিসংখ্যান নয়—এটি আমাদের অবহেলা ও অদূরদর্শিতার এক নগ্ন চিত্রও তুলে ধরছে। একসময় ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত ডেঙ্গু এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এখনো মশা নিধন বা প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে কোনো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। রাজধানীর বাইরে অধিকাংশ পৌরসভা ও ইউনিয়নে মশা মারার অভিযান নেই বললেই চলে। এমনকি বড় শহরগুলোর সিটি করপোরেশনও কার্যত দায়সারা মনোভাবেই কাজ করছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, “আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছর ডেঙ্গু বাংলাদেশের মফস্বলে এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হবে। এখনই যদি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রতিরোধের উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে এটি থামানো যাবে না।” তার মতে, শুধুমাত্র পৌরসভা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রচেষ্টা দিয়ে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এটি মোকাবিলায় দরকার একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল, যেখানে স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবেশ অধিদফতর এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

অন্যদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বর্তমান মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “আমরা বাস্তবে কাজের চেয়ে দেখানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিই। লোক দেখানো কর্মসূচির কারণেই ডেঙ্গু কমে না। একই ধরনের স্প্রে বা ওষুধ দিয়ে আমরা বছরের পর বছর মশা মারার চেষ্টা করি, কিন্তু কোনো স্থায়ী ফলাফল পাওয়া যায় না।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন, এডিস ও কিউলেক্স মশার প্রজনন ও আচরণ একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার পানিতে জন্ম নেয় এবং দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে, অন্যদিকে কিউলেক্স মশা ময়লা পানিতে বংশবিস্তার করে ও রাতে বেশি সক্রিয় থাকে। “এই দুই ধরণের মশা একই পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কিন্তু সিটি করপোরেশনগুলো এই মৌলিক পার্থক্য উপেক্ষা করে একটিই পদ্ধতি ব্যবহার করছে। ফলে প্রকৃত কোনো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না,” বলেন ড. বাশার।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছর সারাদেশে ইতোমধ্যেই ৭৭ হাজারেরও বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ২২ হাজার রোগী রাজধানী ঢাকায়, বাকিদের বেশিরভাগই জেলার শহর ও উপজেলা পর্যায়ে। কিন্তু মশা নিধন কার্যক্রম এখনো ঢাকাকেন্দ্রিকই থেকে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কেন্দ্রীয় মনোভাবই ডেঙ্গু বিস্তারের অন্যতম কারণ।

অবস্থা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে কারণ এখনো শীত আসেনি। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টায় এডিস মশার প্রজনন কিছুটা কমে যায়। কিন্তু বর্তমানে তাপমাত্রা ও বৃষ্টির অনিয়মিত ধারা মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে নভেম্বরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ছে, যা আগে দেখা যায়নি।

এমন পরিস্থিতিতে বরগুনা, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলা হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীতে। অনেক হাসপাতালে শয্যা না থাকায় রোগীদের মেঝেতে বা করিডরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সদের ওপরও পড়ছে তীব্র চাপ। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, মশা নিধনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। ফগার মেশিন বা লার্ভা নিধন ওষুধ ছিটানোর কাজ হয় কেবল কাগজে-কলমে।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দাবি করছে, রাজধানীতে মৃত্যুর সংখ্যা বাস্তবের তুলনায় বেশি দেখানো হচ্ছে কারণ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গুরুতর রোগীরা ঢাকায় এসে চিকিৎসা নেন এবং তাদের মৃত্যু সাউথ সিটির আওতাধীন হাসপাতালগুলোতে হয়। করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, “জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে এখন বিশেষ কর্মসূচির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, যেখানে স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠনকে যুক্ত করা হবে।”

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ‘অভিযানধর্মী’ কার্যক্রম টেকসই নয়। বরং নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ছাড়া কোনো মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ড. কবিরুল বাশারের মতে, “প্রতিবার পরিস্থিতি খারাপ হলে হঠাৎ করে ফগিং বাড়ানো হয়, পোস্টার লাগানো হয়, মাইকিং করা হয়—এরপর আবার সব চুপচাপ। অথচ মশার জীবনচক্র অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে আগামী বছর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।”

ডেঙ্গু শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ ফেলছে না, এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। প্রতিদিন সংবাদে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা শুনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে পরিবারে পরিবারে। বিশেষ করে শিশুরা এখন ভয় পাচ্ছে মশার কামড়কেও। অনেক এলাকায় সন্ধ্যার পর দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে, ঘরে ব্যবহার করা হচ্ছে একাধিক কয়েল ও বৈদ্যুতিক র‍্যাকেট। কিন্তু তবুও মশার দৌরাত্ম্য থামছে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সময় ডেঙ্গুকে “মৌসুমি রোগ” হিসেবে না দেখে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করার। বরগুনার ঘটনাটি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। এখন যদি সরকার, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণে নামতে না পারে, তবে আগামী বছরগুলোতে ডেঙ্গু বাংলাদেশে এক স্থায়ী জনস্বাস্থ্য দুর্যোগে পরিণত হবে।

সবশেষে, কীটতত্ত্ববিদদের সতর্কবার্তা খুব স্পষ্ট—শীতের আগে ডেঙ্গু থামবে না। বরং জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ভবিষ্যতে এডিস মশা আরও অভিযোজিত হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন “দেখানোর উদ্যোগ” নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপ—যেখানে প্রতিটি শহর, জেলা, গ্রাম একযোগে মশামুক্ত পরিবেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি নেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত