মামদানির বিজয়: বাংলাদেশের তরুণদের নতুন আলোর পথ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
মামদানির বিজয়: বাংলাদেশের তরুণদের নতুন আলোর পথ

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নিউ ইয়র্কের রাজনৈতিক আকাশে একটি নতুন তারা উদিত হয়েছে, যার আলো শুধু আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহরকেই নয়, বরং বিশ্বের দূরপ্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। ৩৪ বছর বয়সী জোহরান মামদানি, উগান্ডায় জন্মগ্রহণকারী একজন মুসলিম তরুণ, গত ৪ নভেম্বর নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছেন। তিনি শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র এবং এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর সবচেয়ে তরুণ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন জানুয়ারি ২০২৬ থেকে। এই বিজয় শুধু একটি নির্বাচনের ফলাফল নয়; এটি একটি মানবিক গল্প, যেখানে একজন সাধারণ তরুণ তার অটল বিশ্বাস, সততা এবং জনগণের সঙ্গে গভীর সংযোগের মাধ্যমে ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করে জয়লাভ করেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লব ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে, মামদানির এই সাফল্য আমাদের তরুণদের জন্য একটি আয়না—যা তাদের নিজেদের শক্তি, দুর্বলতা এবং ভবিষ্যতের পথ দেখিয়ে দেয়। এই বিজয়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি শিক্ষা: ক্ষমতা অর্থের লেনদেন নয়, মানুষের হৃদয় জয়ের ফল।

জোহরান মামদানির জীবনকাহিনি শুরু হয় উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায়, ১৯৯১ সালের ১৮ অক্টোবর। তিনি বিখ্যাত ঔপনিবেশিকতাবাদ-বিরোধী পণ্ডিত মাহমুদ মামদানি এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নাইরের একমাত্র সন্তান। মাহমুদ মামদানি, গুজরাটের শিয়া মুসলিম বংশোদ্ভূত, হার্ভার্ড থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি করে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, যেখানে তিনি আফ্রিকান ও দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণ দিয়ে বিশ্বকে প্রভাবিত করেছেন। মীরা নাইর, পাঞ্জাবের হিন্দু পরিবারের মেয়ে, ‘সালাম বম্বে’ এবং ‘মনসুন ওয়েডিং’-এর মতো চলচ্চিত্র দিয়ে দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির কথা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং ২০১২ সালে ভারতের পদ্মভূষণ পুরস্কার লাভ করেছেন। এই দম্পতির সন্তান জোহরানের শৈশব কেটেছে আফ্রিকার মাটিতে, যেখানে তিনি ভারতীয়, উগান্ডীয় এবং আমেরিকান সংস্কৃতির মিশেলে বড় হয়েছেন। পাঁচ বছর বয়সে তারা কেপ টাউনে চলে যান, এবং সাত বছর বয়সে নিউ ইয়র্কে বসতি গেড়েছিলেন। ব্রঙ্কস হাই স্কুল অফ সায়েন্স এবং বোয়ডিন কলেজ থেকে আফ্রিকানা স্টাডিজে স্নাতক হয়ে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এই বহুসাংস্কৃতিক পটভূমি মামদানিকে শিখিয়েছে সহনশীলতা এবং ন্যায়ের জন্য লড়াই—যা তার রাজনৈতিক জীবনের মূল চালিকাশক্তি।

ঢাকা ও আশপাশের জেলায় ১৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

এই বছরই মামদানি সিরিয়ান-আমেরিকান চিত্রশিল্পী রামা দুয়াজিকে বিয়ে করেছেন, যিনি ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি থেকে ফাইন আর্টসে পড়াশোনা করে গাজার গণহত্যার ওপর চিত্রকর্ম তৈরি করেন। এই বিয়েটি শুধু ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি মামদানির জীবনের একটি প্রতীক—বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলনে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি। কিন্তু তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালে, যখন তিনি নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির ৩৬তম জেলা থেকে নির্বাচিত হন। ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট অফ আমেরিকার সদস্য হিসেবে তিনি সস্তা আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমিক অধিকারের পক্ষে লড়াই করেছেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে মেয়র নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি একটি অসম্ভব যাত্রা শুরু করেন, যা আজ বিশ্বব্যাপী আলোচিত।

মামদানির বিজয়ের পেছনে রয়েছে একটি অদম্য সততা, যা আমেরিকার ইসলামোফোবিক সমাজে মুসলিম পরিচয় নিয়ে গর্বিত হওয়ার সাহস দেখায়। নিউ ইয়র্কের উল্লেখযোগ্য ইহুদি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও তিনি ফিলিস্তিন ইস্যুতে অটল—গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আইসিসি ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের প্রস্তাব দিয়ে। এই অবস্থান তার নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করে তুলেছিল: ধনকুবেররা, জায়োনিস্ট গ্রুপ এবং এমনকি তার নিজের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রভাবশালী অংশ তার বিরোধিতা করে। প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো, যিনি ইসরায়েল-সমর্থক এবং অভিজ্ঞতার দম্ভ নিয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন, ২৬ মিলিয়ন ডলারের সুপার প্যাক ফান্ডিং নিয়ে মামদানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। রিপাবলিকান কার্টিস স্লিওয়া এবং ক্যাপিটালিস্ট মিডিয়া, যা জায়োনিস্ট-নিয়ন্ত্রিত বলে অভিযোগ উঠেছে, তাকে ‘র‍্যাডিক্যাল কমিউনিস্ট’ বলে প্রচার করে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে মাঠে নেমে তার বিরোধিতা করেন, যা আমেরিকার ইতিহাসে অভূতপূর্ব। কিন্তু মামদানি পিছু হটেননি; তিনি তার ম্যানিফেস্টোতে ধনীদের উপর কর আরোপ করে সামাজিক কর্মসূচি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন, যা ধনকুবেরদের স্বার্থের সরাসরি বিরোধী।

তবু, এই বৈরী পরিবেশকে অতিক্রম করে মামদানি কীভাবে জয়লাভ করলেন? উত্তর রয়েছে তার ক্যাম্পেইনের মানবিক এবং জনকেন্দ্রিক কৌশলে। তিনি নিউ ইয়র্কের সাধারণ মানুষের কষ্টকে কেন্দ্র করে—উচ্চ ভাড়া, যাতায়াতের খরচ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি—একটি স্পষ্ট বয়ান তৈরি করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ভিডিও, ঘরে ঘরে গিয়ে কথা বলা এবং বহুভাষিক প্রচার (হিন্দি, স্প্যানিশ, বাংলা) তার অস্ত্র ছিল। বাংলাদেশি ‘আন্টি’দের মতো স্বেচ্ছাসেবকরা দরজায় দরজায় গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যা তার বিজয়ের মূলে রয়েছে। তার স্ত্রী রামা দুয়াজির সঙ্গে এককক্ষের ছোট অ্যাপার্টমেন্টে থাকা তার সরল জীবনযাপনের প্রতীক, যা ভোটারদের মনে সততার ছাপ ফেলে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে তার ব্যক্তিগত নির্ভেখতা এবং তারুণ্য (৩০ বছরের নিচে ৭৮% ভোটার তার পক্ষে) তরুণদের আকর্ষণ করে। জেন-জি প্রজন্ম ‘স্ট্যাটাস কো’-কে ভেঙে ফেলার স্বপ্ন দেখে, এবং মামদানির ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান তাদের মধ্যে একটি বিবেকীয় জাগরণ ঘটায়। কুয়োমোর অভিজ্ঞতার দম্ভ এবং ইসরায়েল-সমর্থন তার জন্য বুমেরাং হয়, কারণ তরুণরা অন্ধ আনুগত্যকে আর সহ্য করতে চায় না। ফলে, প্রাইমারিতে ৪৩.৫% এবং জেনারেলে ৫০.৩% ভোট নিয়ে তিনি জয়লাভ করেন।

এই বিজয়ের আলোয় বাংলাদেশের দিকে তাকালে একটি গভীর প্রতিফলন জাগে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে আমাদের তরুণরা, নাহিদ ইসলাম বা আসিফ মাহমুদের মতো নেতৃত্বে, রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী শাসন উৎখাত করেছে। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস তাদের ‘বিপ্লবের মাস্টারমাইন্ড’ বলে অভিহিত করেছেন, এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তাদের স্থান দিয়েছেন। কিন্তু বিপ্লবের পরবর্তী পর্যায়ে তরুণরা রাজনীতিতে নতুন বয়ান আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ৮-১০ কোটি টাকা খরচ করে রোড শোর রাজনীতির পরিবর্তে ঘরে ঘরে গিয়ে জনগণের কথা শোনার অভাব দেখা গেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অটলতা এবং স্পষ্ট মতাদর্শের অভাবে তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। মামদানির গল্প আমাদের তরুণদের শেখায় যে, জনপ্রিয়তা রাতারাতি আসে না; এটি একটি প্রক্রিয়া, যেখানে স্টেট অ্যাসেম্বলি থেকে মেয়র পর্যন্ত ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হয়। বাংলাদেশের জেন-জি যোদ্ধারা, যারা বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে ইতিহাস রচনা করেছে, এখন সংগঠিত হয়ে নতুন রাষ্ট্রধারণা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহসী বয়ান নিয়ে দাঁড়াতে পারে।

মামদানির ক্যাম্পেইনের মতো, আমাদের তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়া এবং পায়ে হাঁটার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। বাংলাদেশি অভিবাসীদের মতো নিউ ইয়র্কে ‘আন্টি’দের ভূমিকা দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, রাজনীতি উৎসবমুখর হতে পারে—যেমন তার বিজয় উদযাপনে ‘ধুম’ গান বাজিয়ে নাচা। এটি আমাদের তরুণদের অনুপ্রাণিত করে যে, রাজনীতি শুধু বিতর্ক নয়; এটি আনন্দ এবং সম্পর্কের ব্যাপার। বিপ্লবের পর অনভিজ্ঞতায় তারা হোঁচট খেয়েছে, কিন্তু মামদানির মতো সততা এবং জনকেন্দ্রিকতা তাদের পথ দেখাবে। জাতীয় নির্বাচনের আগে তারা বহু যুগের দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করে নতুন দিশা বর্ণনা করতে পারে। আমাদের মতো ‘আধমরা’ প্রজন্মের ঘা মারা সত্ত্বেও, এই তরুণরাই ইনশাআল্লাহ জাতিকে বাঁচাবে।

মামদানির বিজয় আমেরিকায় একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে, যা ট্রাম্পের মতো নেতাদের চ্যালেঞ্জ করে। তিনি বলেছেন, “নিউ ইয়র্ক অভিবাসীদের শহর, এবং আমি একজন অভিবাসী হিসেবে এটি নেতৃত্ব দেব।” বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এটি একটি আহ্বান: বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে রাখুন, সততা এবং সংগঠনের মাধ্যমে। এই বিজয়ের মানবিকতা—একজন তরুণের স্বপ্ন, পরিবারের সমর্থন এবং জনগণের বিশ্বাস—আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবর্তন সম্ভব, যদি আমরা হার না মানি। জুলাইয়ের যোদ্ধারা, তোমরা পরবর্তী মামদানি হতে পারো—শুধু বিশ্বাস রাখো এবং পথ চলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত