নির্বাচনের আগে ‘ধর্মীয় কার্ড’ ঘোড়ায় আনছে আ.লীগের ঘনিষ্ঠরা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৪ বার
নির্বাচনের আগে ‘ধর্মীয় কার্ড’ ঘোড়ায় আনছে আ.লীগের ঘনিষ্ঠরা

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন ধাক্কা তৈরি করেছে বিতর্কিত ধর্মীয় সংগঠন ইসকন। দীর্ঘদিনের নিষিদ্ধ ও উগ্রধর্মীয় ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এই সংগঠন নিজেকে পুনর্গঠন করে দেশজুড়ে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থানরত প্রভাবশালী নেতাদের সহযোগিতায় এবং দেশে পলাতক আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ নেতাদের সমর্থনে ইসকন নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। সংগঠনটি কৌশলে পূজা উদযাপন পরিষদ, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ, রামসেনা ও শিবসেনাসহ দেশের বিভিন্ন নামসর্বস্ব ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃত্ব দখল করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা করছে।

চট্টগ্রামের ইসকন মন্দিরের আন্ডারগ্রাউন্ড অংশ এখন এই সমন্বয়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে। সেখানে নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেসব বৈঠকে দেশ ও বিদেশে অবস্থানরত ইসকন নেতারা ভার্চুয়ালি অংশ নিচ্ছেন। বিশেষভাবে ভারতের কলকাতা ও ত্রিপুরায় অবস্থানরত নেতারা এই বৈঠকে নির্দেশনা দিচ্ছেন। গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গত এক বছরে অন্তত ১৩টি সংগঠনের নামে হাজারেরও বেশি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি ধর্মীয় উৎসবকে ঢেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।

ইসকনের কর্মীরা গেরুয়া পোশাক ত্যাগ করে সাধারণ ভক্তের ভূষণ ধারণ করে উৎসবে অংশ নিচ্ছেন, যাতে স্থানীয়ভাবে তাদের কার্যক্রম সন্দেহভাজন মনে না হয়। গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন, বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারের নামে উগ্রবাদী এজেন্ডা চালানোর চেষ্টা চলেছে। নির্বাচনের আগে এই ধরনের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

গত ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অনুষ্ঠিত শিব চতুর্দশী মেলায় ইসকনের নতুন কৌশল প্রথমবার ধরা পড়ে। রামসেনাসহ তিনটি সংগঠনের ব্যানারে শতাধিক তরুণরা অংশ নেন এবং তাদের আচরণে ইসকনের ছাপ স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। জন্মাষ্টমীর র‌্যালিতে ‘চিন্ময়ের মুক্তি চাই’ লেখা প্লাকার্ড প্রদর্শন করে রামসেনার সদস্যরা। যদিও কিছু ব্যক্তিকে আটক করা হয়, স্থানীয় ইসকন নেতাদের প্রভাবে তারা মুক্তি পেয়ে যায়।

প্রবর্তক ইসকন নেতারা, বিশেষ করে চন্দন ধর বা চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ, তখন সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং রাজনৈতিক দাবিসমূহ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। সনাতনী জাগরণী জোটের ব্যানারে এসব কর্মকাণ্ড হলেও নেপথ্যে ইসকন সক্রিয় থাকে। ইসকনের এই কর্মকাণ্ড ভারতীয় মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচারিত হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং মৌলবাদের উত্থান হিসেবে প্রতিপাদিত হওয়ার চেষ্টা করে।

ইসকনের গেরুয়া সন্ত্রাসীরা দীর্ঘমেয়াদি মুখোশ রাখতে পারেননি। জাতীয় পতাকার ওপর গেরুয়া পতাকা প্রতিস্থাপন এবং subsequent রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার কারণে চিন্ময় দাশ গ্রেপ্তার হন। আদালতের ওপর চড়াও হওয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে পিটিয়ে হত্যা—এসব ঘটনায় ইসকন দেশের মানুষের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ হয়নি, সামাজিক প্রতিরোধের কারণে তাদের কার্যক্রম সীমিত হয়ে গেছে।

নির্দিষ্টভাবে কার্যক্রম না চালিয়ে ইসকন এখন নিজেদের সদস্যদের বিভিন্ন নামসর্বস্ব ধর্মীয় সংগঠনের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে রামসেনা, হিন্দুস্তান পরিবার, বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোট, হিন্দু ছাত্র পরিষদ, জাগো হিন্দু পরিষদ, বিশ্ব সনাতন মোর্চা, সনাতনী জাগরণ জোট। এসব সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন আ.লীগের ঘনিষ্ঠ নেতারা, অনেকে একই সঙ্গে ইসকনের সদস্য।

চট্টগ্রামের জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সক্রিয়। কমিটির নেতারা প্রতি সপ্তাহে একদিন ইসকন মন্দিরের আন্ডারগ্রাউন্ডে বৈঠক করেন। ভার্চুয়ালি এই বৈঠকে অংশ নেন পলাতক শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া ভিডিও ও ছবি এই বৈঠকগুলোতে নেতৃত্বের সক্রিয়তা নিশ্চিত করেছে।

কমিটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আছেন চন্দন কুমার, যিনি ২০২৪ সালের চট্টগ্রাম আদালতের ঘটনাসহ ছাত্র আন্দোলনের দমন-পীড়নে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব পার্থ আগে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং ইসকনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখেন। এছাড়াও, আর কে দাশ, কাজল দাশ, রতন আচার্য, নিখিল নাথ, অশোক দত্তসহ বেশিরভাগ নেতা একসঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পদে এবং ইসকনের কার্যক্রমে সক্রিয়।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের একাধিক নেতা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামে সফর করে আরএসএস ও বিজেপির আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠক এবং সংযোগ দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এক বছরের মধ্যে এসব সংগঠনের নেতৃত্ব, অর্থ, প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের মাধ্যমে ইসকন নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেছে। ধর্মীয় পরিচয়কে আড়াল করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন, নির্বাচনকে সামনে রেখে অস্থিরতা তৈরি এবং দেশজুড়ে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সুক্ষ্ম কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ, যেখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ভোটের আগে ‘ধর্মীয় কার্ড’ খেলা এবং দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইসকনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, স্থানীয় নেতাদের সংযোগ এবং নির্বাচনের আগে এই সমস্ত কর্মকাণ্ড দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সংবেদনশীল করে তুলেছে।

এভাবে, নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসকন এবং তাদের সমর্থকরা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মিথষ্ক্রিয়া চালিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা তথ্য, স্থানীয় পর্যবেক্ষণ এবং রাজনৈতিক সংযোগ বিশ্লেষণে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, দেশের নির্বাচন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত