আফগানিস্তানে অধিকাংশ মানুষ খাদ্য ঘাটতি ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩২ বার
আফগানিস্তানে অধিকাংশ মানুষ খাদ্য ঘাটতি ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

আফগানিস্তানের মানবিক পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে ৯টি বর্তমানে খাদ্য ঘাটতি, ঋণগ্রস্ততা এবং জীবিকার অনিশ্চয়তায় ভুগছে। মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিনই কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—খাবার বাদ দিচ্ছে, সামান্য সম্পদ বিক্রি করছে বা ঋণের জালে জড়াচ্ছে। ইউএনডিপির সতর্কতা, ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে আফগানিস্তান এখন সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখোমুখি, যা বিদেশ থেকে ব্যাপক প্রত্যাবাসনের ফলে আরও গভীর হচ্ছে।

ইউএনডিপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর থেকে প্রায় ৪৫ লাখেরও বেশি আফগান নাগরিক ইরান ও পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ফিরে এসেছে। এর ফলে আফগানিস্তানের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে, যা দেশের ইতিমধ্যেই ভঙ্গুর অর্থনীতি ও সামাজিক অবকাঠামোর ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। এদের অনেকেই ফিরে এসে আশ্রয়, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও চাকরির অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্প, বন্যা ও খরায় প্রায় আট হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। ইউএনডিপি বলছে, এসব বিপর্যয়ে জনসেবা ব্যবস্থা এখন “সীমার বাইরে” গিয়ে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা দেশের বহু এলাকায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

৪৮,০০০ পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি প্রত্যাবাসিত পরিবার চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে খাবার কেনার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। প্রায় ৪৫ শতাংশ পরিবার নিরাপদ পানির অভাবে খোলা ঝর্ণা বা অপরিশোধিত কূপের পানি ব্যবহার করছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার ঋণের ভারে জর্জরিত। গড় ঋণের পরিমাণ ৩৭৩ থেকে ৯০০ ডলার—যা আফগানিস্তানের মাসিক গড় আয়ের প্রায় পাঁচগুণ এবং বার্ষিক মাথাপিছু জিডিপির প্রায় অর্ধেক।

প্রতিবেদন বলছে, যেসব অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মানুষ ফিরে এসেছে, সেখানে একজন শিক্ষককে ৭০ থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থীর পাঠদানের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। শিশু শ্রমের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশে, আর বেকারত্বের হার ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে। গড় মাসিক আয় মাত্র ৬,৬২৩ আফগানি বা প্রায় ১০০ ডলার, অথচ ভাড়ার খরচ গত এক বছরে তিনগুণ বেড়েছে।

ইউএনডিপি সতর্ক করে জানিয়েছে, জরুরি সহায়তা ছাড়া আফগানিস্তান আরও গভীর দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও জোরপূর্বক অভিবাসনের সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে। সংস্থাটি বলছে, ২০২১ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। জাতিসংঘের ৩.১ বিলিয়ন ডলারের তহবিল চাহিদার সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত পূরণ হয়েছে, ফলে ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক পূর্ব আফগানিস্তানের ভূমিকম্পের পর তালেবান সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। তবে পাকিস্তান কর্তৃক আফগান নাগরিকদের গণপ্রত্যাবাসনের বিষয়ে উদ্বেগ জানালেও শরণার্থী ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়সহ তালেবান প্রশাসনের কোনো দপ্তর এখনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুরা। ইউএনডিপির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আফগানিস্তানে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ মাত্র ৬ শতাংশ, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও কর্মসংস্থানে সীমাবদ্ধতা নারী প্রধান পরিবারগুলোকে বিশেষভাবে বিপর্যস্ত করেছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার না থাকায় তারা টিকে থাকার লড়াইয়ে নিঃস্ব প্রায়।

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ইউএনডিপি পরিচালক কানি উইগ্নারাজা বলেন, “কিছু প্রদেশে প্রতি চারটি পরিবারের একটিতে নারীই প্রধান উপার্জনকারী। অথচ নারীদের কাজ করতে না দিলে শুধু পরিবার নয়, গোটা দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

প্রতিবেদন আরও জানায়, কিছু জেলায় প্রত্যাবাসিত পরিবারের ২৬ শতাংশ পর্যন্ত নারী প্রধান পরিবার। এই পরিবারগুলো খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, ঋণগ্রস্ততা এবং পুনরায় বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি। ইউএনডিপি তালেবান প্রশাসনকে নারী কর্মসংস্থান ও সামাজিক সেবা খাতে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক দাতাদের নারী সহায়তা কর্মীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছে।

উইগ্নারাজা বলেন, “নারীদের মানবিক সহায়তার সামনের সারি থেকে সরিয়ে দিলে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সেবা থেকে অসংখ্য মানুষ বঞ্চিত হবে। আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে নারীদের অংশগ্রহণই হতে হবে পুনর্গঠনের মূল চাবিকাঠি।”

আফগানিস্তানের বর্তমান চিত্র এক ভয়াবহ বাস্তবতা—যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও হতাশা প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সংকট ও সামাজিক অব্যবস্থা দেশটিকে আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইউএনডিপির মতে, দ্রুত ও কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ ছাড়া আফগানিস্তানের মানবিক বিপর্যয় আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে—যার প্রতিক্রিয়া সীমান্ত ছাড়িয়ে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত