প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ বুধবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলায় বিপুল পরিমাণ পেট্রল বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুরে আজিমনগর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণপাড়া গ্রামের সৌদি প্রবাসী টিটু সরদারের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে এসব বিপজ্জনক সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। এসময় ঘটনাস্থল থেকে তিন যুবককে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এলাকায় নাশকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এই বোমাগুলো তৈরি করা হচ্ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভাঙ্গা থানা পুলিশ জানতে পারে, আজিমনগর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণপাড়া এলাকায় একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে পেট্রল বোমা তৈরির কার্যক্রম চলছে। খবর পেয়ে ভাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ আশরাফ হোসেনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। অভিযানে উপস্থিত ছিলেন এসআই মিজান, মোশাররফ ও মশিউর রহমানসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা। তারা বাড়িটিতে প্রবেশ করে শতাধিক পেট্রল বোমা, হাতবোমা এবং বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করেন।
ওসি আশরাফ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, উদ্ধার করা বোমাগুলোর মধ্যে বেশ কিছু আধা-তৈরি অবস্থায় ছিল, বাকিগুলো প্রস্তুত ছিল ব্যবহারের জন্য। তিনি বলেন, “আমরা গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করেছি। তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, স্থানীয়ভাবে নাশকতা সৃষ্টির জন্য এই বোমাগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছিল। বিষয়টি খুবই সংবেদনশীল, তাই তদন্তের স্বার্থে এখনই আটক ব্যক্তিদের বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করা যাচ্ছে না।”
ভাঙ্গা থানার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসিফ ইকবাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেন। তিনি বলেন, “বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও বিস্ফোরক উদ্ধার একটি গুরুতর বিষয়। এটি শুধু ভাঙ্গা নয়, পুরো ফরিদপুর অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে, তাদের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, যে বাড়িতে বোমাগুলো পাওয়া গেছে, সেটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। মালিক সৌদি প্রবাসে থাকায় বাড়িটি খালি পড়ে ছিল। সম্প্রতি কিছু অপরিচিত যুবককে ওই এলাকায় আসা–যাওয়া করতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের সন্দেহ, ওই যুবকেরাই গোপনে বাড়িটিতে প্রবেশ করে বোমা তৈরির কাজ চালাচ্ছিল।
আজিমনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ ভাঙ্গায় রাজনৈতিক সমাবেশ ও লকডাউন কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। এর একদিন আগে বিপুল পরিমাণ বোমা উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই ঘটনায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
এদিকে, ভাঙ্গার সাধারণ মানুষ ঘটনাটিতে চরম আতঙ্কে রয়েছে। অনেকেই বলছেন, বোমা উদ্ধার ও নাশকতার আশঙ্কা গ্রামীণ জনগণের নিরাপত্তাবোধে প্রভাব ফেলেছে। স্থানীয় দোকানপাট ও বাজারে দিনভর এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। এলাকার স্কুল–কলেজগামী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার করা বোমাগুলো পরীক্ষা ও নিষ্ক্রিয় করার জন্য বিশেষজ্ঞ দল ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। এসব বোমা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ ঘটানোর মতো সক্ষমতা রাখে। তদন্ত শেষে এসব বিস্ফোরক ধ্বংস করা হবে এবং এর উৎস ও আর্থিক সহায়তাকারীদের খোঁজে অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
ভাঙ্গা উপজেলার রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে এই ঘটনা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে একটি মহল দেশে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। আবার অনেকে বলছেন, এটি হয়তো স্থানীয়ভাবে চুরি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি হতে পারে। তবে পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে এটি রাজনৈতিক নাশকতার পরিকল্পনার অংশ বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এ ঘটনার পর থেকে পুরো আজিমনগর ইউনিয়নে টহল জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও তৎপর করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, কেউ গুজব ছড়ালে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, “আমরা ঘটনাটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। দেশে চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুরো চক্রটি শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।”
ভাঙ্গার সাধারণ জনগণ এখন একটাই প্রত্যাশা করছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন দ্রুত দোষীদের আইনের আওতায় আনে এবং এলাকায় শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখে।