প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আজ বৃহস্পতিবার নির্ধারিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অতি সংবেদনশীল মামলার রায় ঘোষণার তারিখ। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রমের চূড়ান্ত পর্যায়ে আজ আদালতে হাজির করা হয়েছে রাজসাক্ষী ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে। সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ ঘিরে দেখা গেছে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলাটি বর্তমানে রায়ের অপেক্ষার তালিকায় ১ নম্বরে রয়েছে। আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আজই নির্ধারিত হবে মামলার রায় ঘোষণার দিন। এদিনের শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউশন ও প্রতিরক্ষা পক্ষের আইনজীবীরা। ট্রাইব্যুনালে সকাল আটটা থেকেই শুরু হয় কড়াকড়ি তল্লাশি, আদালত চত্বরে মোতায়েন করা হয় পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে আদালতে আনা হয় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে, যিনি এর আগে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তার উপস্থিতি ঘিরে আদালত চত্বরে মুহূর্তেই টানটান উত্তেজনা তৈরি হয়। মামুনকে আদালতে আনার সময় তার মুখে ছিল গম্ভীরতা, তবে চোখেমুখে কোনো ভয়ের ছাপ ছিল না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, “আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি, সত্য বলেছি, এখন ট্রাইব্যুনালের ওপর আস্থা রাখি।”
এদিকে বুধবার বিকেলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম আবারও শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, “রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমরা আশা করছি আজই রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ হবে। প্রমাণ ও সাক্ষ্য অনুযায়ী আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত।”
মামলার দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় গত বছরের মে মাসে। ২০২৪ সালের ১২ মে তদন্ত সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে প্রসিকিউশনের কাছে। এরপর ১ জুন রাষ্ট্রপক্ষ শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি হিসেবে চিহ্নিত করে অভিযোগ দাখিল করে। ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করার নির্দেশ দেয়। এর পর থেকেই আদালতে শুরু হয় একাধিক দফায় সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক।
এই মামলার সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের রাজসাক্ষী হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এক সময় শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত মামুন পরবর্তীতে দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন জানান। তার আবেদন মঞ্জুর করার পর ট্রাইব্যুনালে বিস্তারিত সাক্ষ্য দেন তিনি। প্রসিকিউশন বলছে, মামুনের সাক্ষ্য মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং আসামিদের বিরুদ্ধে ‘স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ’ সরবরাহ করেছে।
ঐতিহাসিক এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীক শহীদ আবু সাঈদের বাবা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। পাশাপাশি সাক্ষ্য দিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরাও। স্টার উইটনেস হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘আমার দেশ’-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী নাহিদ ইসলাম। লিখিত সাক্ষ্য দিয়েছেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে ৫৪ জন সাক্ষী তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পাঁচটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন করেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে হত্যা, ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা, উসকানি ও পরিকল্পনা।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। তিনি আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে উল্লেখ করেন। এর প্রেক্ষিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল ও আইজিপি মামুনের নেতৃত্বে সরকারি বাহিনী ও দলীয় সন্ত্রাসীরা আন্দোলনরত ছাত্র ও জনতার ওপর নির্বিচারে আক্রমণ চালায়, যাতে বহু হতাহত হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলন দমন করতে নির্দেশ দেন। তার আদেশ বাস্তবায়ন করেন কামাল ও মামুন। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ হত্যার ঘটনাটি মামলার তৃতীয় অভিযোগ হিসেবে গঠিত হয়। চতুর্থ অভিযোগে রয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ছয়জন আন্দোলনকারীর গুলি করে হত্যার অভিযোগ। পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, একই দিনে আশুলিয়ায় ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করা হয়, পরে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়—যার প্রত্যক্ষ নির্দেশদাতা ছিলেন শেখ হাসিনা ও তার দুই সহযোগী।
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, মামলাটি “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে প্রণোদিত” এবং “প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে”। তাদের বক্তব্য, তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছিল, ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে নয়। তবে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণগুলো এমন পর্যায়ের যে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পূর্ণাঙ্গ বিচার নিশ্চিত করে।
বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের একাংশ বলছে, তিনি “রাজনৈতিক আশ্রয়ে” আছেন। হাসিনার অনুপস্থিতিতে মামলাটি পরিচালিত হলেও আদালত তার আইনজীবীদের উপস্থিতিতে বিচার সম্পন্ন করেছে।
রায়ের দিন ঘিরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা বিরাজ করছে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু অংশ রাজধানীতে বিচ্ছিন্ন নাশকতার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত রাতে ঢাকার কয়েকটি এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়। ট্রাইব্যুনাল চত্বরে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র্যাব ও সেনা সদস্য। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, “কোনো বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না।”
আজকের শুনানি শেষ হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আদালত কক্ষের বাইরে উপস্থিত সাংবাদিকরা বলছেন, আজকের দিন বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই রায় শুধু তিনজন আসামির ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও এ মামলাকে ঘিরে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিবিসি, রয়টার্স, আলজাজিরা, এনডিটিভি এবং দ্য গার্ডিয়ানসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ট্রাইব্যুনালের সামনে অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষক দলও আজকের শুনানিতে উপস্থিত রয়েছে।
সব চোখ এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দিকে। রাজসাক্ষী মামুনের জবানবন্দি ও রাষ্ট্রপক্ষের চূড়ান্ত বক্তব্যের পর আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা জানার অপেক্ষায় গোটা দেশ। ইতিহাসের এই রায় বাংলাদেশের রাজনীতি, বিচার ও ন্যায়বোধের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।