এক দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের পরিকল্পনা, বাড়তে পারে ভোটের সময়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৬ বার
গণভোট অধ্যাদেশ জারি করল রাষ্ট্রপতি

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজনের সম্ভাবনা এখন দেশের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সংস্কার কমিশনের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, যদি এই দুটি বড় রাজনৈতিক আয়োজন একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়, তবে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে। বর্তমানে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের নিয়ম থাকলেও, নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী তা বাড়িয়ে সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অর্থাৎ ১০ ঘণ্টা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এই উদ্যোগকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা, বিতর্ক ও আগ্রহ সমানভাবে বেড়ে চলেছে। গণভোটে সংবিধান সংশোধন এবং প্রতিনিধিত্বের নতুন কাঠামো নিয়ে দেশজুড়ে যে আলোচনা চলছে, তা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। বিশেষত গণভোট কখন হবে—সংসদ নির্বাচনের আগে, না কি একই দিনে—এই প্রশ্নে ভিন্নমতই এখন রাজনৈতিক মঞ্চে সবচেয়ে বড় বিভাজন তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চাইছে সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হোক, যাতে জনগণের রায় জানা যায় এবং সেই অনুযায়ী নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অন্যদিকে, বিএনপি বলছে, জনগণের ভোটের মূল্য রক্ষায় দুই আয়োজন একসঙ্গেই হওয়া উচিত, যাতে ক্ষমতার রদবদলের আগে রাষ্ট্রের নীতি-দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হয়।

ঐক্যমত সংস্কার কমিশন অবশ্য একদিনেই গণভোট ও সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে। তাদের মতে, একই দিনে ভোটগ্রহণ করলে প্রশাসনিক খরচ ও নিরাপত্তা ব্যয় কমবে, পাশাপাশি ভোটার উপস্থিতিও বাড়বে। কমিশনের এই সুপারিশের পর অন্তবর্তী সরকারও আপাতত এতে আপত্তি জানায়নি।

নির্বাচন কমিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, তারা এখন ধরে নিচ্ছে—দুটি আয়োজন একসঙ্গেই হবে। তাই ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানোসহ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই পরিকল্পনার প্রাথমিক খসড়া তৈরি করছেন ইসির নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখার একজন উপসচিব। সূত্রটি বলছে, গণভোট সংযুক্ত হলে ভোটারদের জন্য নতুন ব্যালট পেপার, গণভোট প্রশ্নের পৃথক বাক্স, নিরাপত্তা কর্মী বৃদ্ধি এবং সময় বাড়ানোর বিষয়টি অপরিহার্য হয়ে পড়বে।

গণভোটের প্রশ্নপত্র কেমন হবে, তা নিয়েও চলছে আলোচনা। ঐক্যমত কমিশন ও ইসির প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, গণভোটে একটি প্রধান প্রশ্ন থাকবে—জনগণ কি সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত সংস্কার প্যাকেজের পক্ষে? ভোটাররা সেখানে কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ চিহ্নিত করতে পারবেন।

একজন নির্বাচন কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট একদিনে হলে জনগণ একযোগে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও নীতিগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নিতে পারবে। এটা গণতান্ত্রিক চর্চার নতুন ধারা তৈরি করবে। তবে একাধিক প্রশ্ন রাখলে গণভোটের সারল্য নষ্ট হবে, আর ভোটারদের জন্য বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠবে।”

সংবিধান সংস্কার নিয়ে তৈরি ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে প্রায় ৩০টির ব্যাপারে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও আরও কিছু দল একমত হয়েছে। এসব প্রস্তাবকে একত্রে একটি প্যাকেজ প্রশ্ন হিসেবে গণভোটে তোলা হবে বলে জানা গেছে। ভোটারদের কাছে সরলভাবে জানতে চাওয়া হবে—তারা কি এই সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে?

তবে বাকি ১৮টি প্রস্তাব নিয়ে এখনও মতবিরোধ রয়ে গেছে। এগুলোর বেশির ভাগই মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব—যেমন নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তন, সংবিধানের ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কিত বিষয়। সূত্র জানিয়েছে, এসব ইস্যু নিয়ে গণভোটে আরও তিন থেকে চারটি পৃথক প্রশ্ন তোলার চিন্তা চলছে, যাতে ভোটাররা নির্দিষ্টভাবে মত দিতে পারেন।

এদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণভোট ও নির্বাচনের একসঙ্গে আয়োজন নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও, সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন ভোটার এলাকায় কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই মনে করছেন একই দিনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভোট আয়োজন করলে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং রাজনৈতিক জটিলতা কমবে।

ঢাকার একটি ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তা বলেন, “এক দিনে দুটি ভোট আয়োজন করতে হলে সময় বাড়ানো একান্তই দরকার। গণভোটে ভোটারদের ব্যাখ্যা পড়তে, বুঝতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা বেশি সময় লাগবে। তাই ১০ ঘণ্টার সময়সীমা বাস্তবসম্মত।”

নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানো ছাড়াও ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, ব্যালট পেপার সরবরাহ, পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং ফলাফল প্রেরণের প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো নিয়েও সমন্বিত পরিকল্পনা নিচ্ছে ইসি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শেষ হলে এই সিদ্ধান্তগুলো আরও স্পষ্ট হবে।

ইতিমধ্যে সরকার জুলাই সনদের আওতায় যে ৪৮টি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করেছে, তার মধ্যেই গণভোট আয়োজনের আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে। এই কাঠামো অনুযায়ী, নির্বাচনের দিন গণভোটের প্রশ্নটি একই ব্যালটে না থাকলেও একই কেন্দ্র ও একই ভোটার তালিকা ব্যবহার করা যাবে।

নির্বাচন কমিশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন একটি অভূতপূর্ব অধ্যায় হবে। এটি সফলভাবে করতে পারলে দেশের গণতন্ত্রে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। তবে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হবে।”

সার্বিকভাবে, দেশের রাজনীতিতে এখন দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে আসন্ন ঘোষণার দিকে। সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলো যখন সিদ্ধান্তের প্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—একটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক এবং স্বচ্ছ নির্বাচনী পরিবেশ। এখন দেখার বিষয়, ঐক্যমত কমিশনের প্রস্তাব কতটা বাস্তবে রূপ নেয় এবং ২০২৫ সালের নির্বাচন-গণভোট কেমন ইতিহাস তৈরি করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত