প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসলাম মানবজাতিকে দুইটি স্বতন্ত্র লিঙ্গে ভাগ করেছে—পুরুষ ও নারী। সৃষ্টিগতভাবে এই দুই লিঙ্গের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও ইসলামিক বিধান সব ক্ষেত্রেই সমান অধিকার, মর্যাদা এবং দায়িত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্য রাখে। পুরুষ ও নারীর দৈনন্দিন জীবন, আচরণ, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম রয়েছে যা সমাজের সুষ্ঠু শৃঙ্খলা রক্ষা করে। একই সঙ্গে ইসলামে নারীর অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা ইতিহাসে অন্য কোনো ধর্মের চেয়ে বিস্তৃত এবং সংবেদনশীলভাবে বিবেচিত।
ইসলামের আগমনের আগে জাহেলি যুগে কন্যাসন্তান হত্যা ছিল সাধারণ প্রথা। ইসলাম এই প্রথাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং কন্যাসন্তানকে পুত্রসন্তানের সমান মর্যাদা প্রদান করেছে। মহানবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি পুত্রসন্তানের চেয়ে কন্যাসন্তানকে অবহেলা করবে না, সে জান্নাতবাসী হবে। এই শিক্ষার মাধ্যমে ইসলাম নিশ্চিত করেছে যে সন্তানদের মধ্যে সমতা এবং মানবিক মূল্যবোধ বজায় থাকবে।
স্ত্রী হিসেবে নারীর অধিকারও ইসলামে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত। আল্লাহ বলেন, “তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে সৎভাবে জীবনযাপন করো” (সুরা আন-নিসা: ১৯)। নারীদের সঙ্গে সদাচরণ এবং সম্মান প্রদানের বিষয়টি শুধুমাত্র দৃষ্টান্তমূলক নয়, বরং এটি সামাজিক শৃঙ্খলা ও পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় রাখার জন্য অপরিহার্য। হজের বিদায় ভাষণে মহানবী (সা.) পুরুষদের সতর্ক করে বলেছেন, নারীদের প্রতি খারাপ আচরণ করা যাবে না, কারণ আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে তাদের গ্রহণ করা হয়েছে।
মা হিসেবে নারীরা সন্তানের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইসলামে মায়ের সম্মান সর্বোচ্চ মর্যাদা পেয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত”। এই বাণী সন্তানের প্রতি মা-বাবার কর্তব্য ও দায়িত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে। শিশুরা তাদের মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বড় হয় এবং পরিবারে সুস্থ সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে।
শিক্ষা গ্রহণের অধিকারও নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক। ইসলাম শুধুমাত্র সুযোগ দেয়নি, বরং জ্ঞান অর্জনকে প্রত্যেক মুসলিম নারীর জন্য ফরজ ঘোষণা করেছে। মহানবী (সা.) বলেন, “জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ।” ইসলামী ইতিহাসে দেখা যায়, হজরত আয়েশা (রা.) ও হজরত আসমা বিনতে উমাইস (রা.) শিক্ষাদান করতেন। হজরত আয়েশার কাছে এক সঙ্গে ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করতেন, যার মধ্যে ৩৮ জন মহিলা ছিলেন এবং বাকিরা পুরুষ। এটি প্রমাণ করে, ইসলামে নারী শিক্ষার অধিকার এবং পুরুষদের সঙ্গে সমান শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক অধিকারও নারীদের জন্য সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত। ইসলামে মেয়েদের বাবার সম্পদের অংশপ্রাপ্তির অধিকার রয়েছে। আল্লাহ বলেন, “বাবা-মা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে পুরুষের অংশ আছে। অনুরূপভাবে নারীর অংশও নির্ধারিত।” এই বিধান নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর পাত্র নির্বাচনের অধিকারও ইসলামে সুস্পষ্টভাবে রয়েছে। নারীদের সম্মানজনক ও সুখী জীবন নিশ্চিত করতে, তাদের স্বাধীনভাবে জীবনসঙ্গী পছন্দ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেনমোহর প্রথার মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে স্ত্রীদের তাদের দেনমোহর প্রদান করো” (সুরা আন-নিসা: ৪)।
ঘরের বাইরে যাতায়াত, চিকিৎসা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকারও ইসলামে নিশ্চিত। নারীরা ঘরের বাইরে যেতে পারে, তবে পর্দা রক্ষা করতে হবে। রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসা গ্রহণের অধিকার তাদের রয়েছে, যা মহানবী (সা.) হজরত ওসমান (রা.)-এর উদাহরণে প্রমাণিত। রাজনৈতিক অধিকারেও নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। হজরত উম্মে সালমা (রা.) বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছেন এবং মহানবী (সা.) পুরুষ ও নারীর মধ্যে কোনো ব্যবধান করেননি।
সার্বিকভাবে, ইসলামে নারীর অধিকার কেবল পরিবারের সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত সকল ক্ষেত্রে নারীর মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষা করে। এটি প্রতিটি মুসলিম নারীর জন্য একটি শক্তিশালী নৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি প্রদান করে, যা সমাজের উন্নয়ন, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, নারীর অধিকার ও মর্যাদার সুরক্ষা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব ও নৈতিক দায়িত্ব। নারীর সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি সমান, ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে, যা মানবজাতির কল্যাণ ও উন্নয়নের পথ সুগম করে।