প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডিসি কর্তৃক প্রায় ৯০ কোটি টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগে চার কোরিয়ান নাগরিক ও এক বাংলাদেশি কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম। আজ বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) এই নির্দেশনা কার্যকর হয়। আদালত পাশাপাশি পরবর্তী নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে বিষয়টি আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তিরও নির্দেশ দিয়েছেন।
নিষিদ্ধ ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক কিউংজু কাং, ইর্য়কওয়ান চোই, জুয়োক ইয়াং, হিসোক কিম এবং বাংলাদেশি নাগরিক মো. সায়েম চৌধুরী। তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপ প্রকল্পে অর্থপ্রদানের জটিলতা এবং চুক্তিভঙ্গ সংক্রান্ত মামলার পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছে।
মামলার সূত্র অনুযায়ী, প্লিয়াডিস কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কনসাল্টিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জুবায়ের আখতার চৌধুরী এডিসির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাদের প্রতিষ্ঠানকে থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে সাব-কন্ট্রাক্টে বিভিন্ন কাজ দেওয়া হয়, কিন্তু এডিসি চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধে অনীহা প্রদর্শন করেছে। এডিসি কর্তৃক চুক্তির বাইরেও অতিরিক্ত কাজ করানো হলেও সেই কাজের জন্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা বকেয়া রাখা হয়েছে। বহুবার দাবি জানানোর পরও টাকা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন জুবায়ের আখতার।
প্রকল্পটি যথেষ্ট বিস্তৃত এবং জটিল। থার্ড টার্মিনাল, মাল্টি-লেভেল কার পার্কিং (এমএলসিপি), এক্সপোর্ট ও ইম্পোর্ট কার্গো টার্মিনালসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি ভবন যেমন আইপিপি, আইপিআর, জেনারেটর হাউস, এসটিপি, ডব্লিউএসএস, পিডব্লিউটিপি, এজিএস, আরএফএফএস সাবস্টেশন ও মেইন বিল্ডিং নির্মাণে প্লিয়াডিস কনস্ট্রাকশন দায়িত্ব পালন করেছে। জুবায়ের আখতারের দাবি, এসব কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্বও তারা পালন করেছেন, যা চুক্তির বাইরে হলেও তা সম্পূর্ণ করা হয়।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই পাঁচজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এটি মূলত নিশ্চিত করতে যে, মামলার কার্যক্রমের সময় তারা দেশের বাইরে চলে না যেতে পারে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিলের জন্য আদালতের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। আইন অনুযায়ী, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়গুলোকে স্বচ্ছ এবং নিয়ন্ত্রিত রাখে।
প্রকল্পটির গুরুত্বও অবহেলা করার নয়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার এবং থার্ড টার্মিনালের নির্মাণ, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন দেশের বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এমএলসিপি ও কার্গো টার্মিনালসহ অন্যান্য উপকাঠামো বিমানবন্দরের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করেছে। সেসব নির্মাণকাজের জন্য যথাযথ অর্থ প্রদানের বিষয়টি প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য।
এডিসি’র পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে মামলার নথি এবং আদালতের আদেশ অনুযায়ী বিষয়টি আপসের মাধ্যমে সমাধানের নির্দেশনা রয়েছে। আপসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বকেয়া অর্থ পরিশোধ ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় সরকারি প্রকল্পে এ ধরনের অর্থনৈতিক বিরোধ স্বাভাবিক হলেও সময়মতো সমাধান না হলে প্রকল্পে দেরি, অতিরিক্ত খরচ ও প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। দেশের জন্য এই ধরনের বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পে ঠিকাদার ও সাব-কন্ট্রাক্টরদের স্বার্থের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এবিষয়ে প্লিয়াডিস কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুবায়ের আখতার চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা প্রকল্পটি সময়মতো ও মানসম্মতভাবে শেষ করেছি। চুক্তিভঙ্গের কারণে আমাদের প্রতিষ্ঠানকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। আদালতের এই পদক্ষেপ আমাদের অধিকার রক্ষা করবে।”
এই ঘটনা দেশের বড় প্রকল্পগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বকেয়া অর্থের দাবি নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইন অনুযায়ী দেশত্যাগে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা, ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পে অর্থ প্রদান ও চুক্তি সম্পর্কিত সমস্যা কমাতে সহায়ক হবে।
সর্বশেষ, আদালতের এই পদক্ষেপ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জন্য স্পষ্ট বার্তা প্রদান করছে যে, চুক্তি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করা ও সময়মতো অর্থ প্রদানের বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের যেমন আর্থিক গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি দেশের বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অপরিহার্য।
এই ধরনের বড় প্রকল্পে বকেয়া অর্থ ও চুক্তি সম্পর্কিত মামলা সমাধান হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রকল্পে ঠিকাদার ও সাব-কন্ট্রাক্টরদের স্বার্থ রক্ষা এবং অর্থ প্রদানের সুষ্ঠু প্রক্রিয়া নিশ্চিত হবে। এর মাধ্যমে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনাও দ্রুত ও নিরাপদভাবে বাস্তবায়িত হবে।
সংক্ষেপে বলা যায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ৯০ কোটি টাকার বকেয়া ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেশের অবকাঠামোগত প্রকল্পে স্বচ্ছতা, আইনগত ন্যায্যতা এবং সময়মতো অর্থ প্রদানের গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে।