ফ্যাসিবাদ, গুম-খুন ও লুটপাট নিয়ে ডকুমেন্টারি প্রদর্শনীতে জনস্রোত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৪ বার
ফ্যাসিবাদ, গুম-খুন ও লুটপাট নিয়ে ডকুমেন্টারি প্রদর্শনীতে জনস্রোত

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ বৃহস্পতিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ফ্যাসিবাদ, গুম-খুন ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়ে তুলতে আয়োজিত ডকুমেন্টারি ফিল্ম প্রদর্শনীতে উপচে পড়া দর্শকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় বুধবার (১২ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত রাজধানীর ১০টি স্থানে একযোগে অনুষ্ঠিত হয় এই বিশেষ প্রদর্শনী।

“ফ্যাসিবাদী, গুম, খুন ও লুটপাট নিয়ে ডকুমেন্টারি ফিল্ম প্রদর্শনী” এবং “জুলাইয়ে গান” শীর্ষক এই আয়োজনে মুক্তচিন্তা, মানবাধিকার, গণআন্দোলন এবং ইতিহাসের বেদনাময় অধ্যায়গুলোকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে পুনর্জাগরিত করা এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে মানবিক চেতনা জাগিয়ে তোলা।

প্রদর্শিত ডকুমেন্টারিগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নির্মিত “জুলাই বীরগাথা (চোখ হারানো মাহবুব)” এবং “জুলাই বিষাদ সিন্ধু (শহীদ হৃদয় তরুয়া ও শহীদ আবু ইসহাক)”। এই দুইটি প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরা হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তরুণদের আত্মত্যাগ, তাদের চোখে দেখা স্বাধীনতার নতুন স্বপ্ন এবং রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের নির্মম বাস্তবতা।

এছাড়াও প্রদর্শিত হয় বহুল আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র “ইউ ফেইলড টু কিল আবরার ফাহাদ”, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ড ও ন্যায়বিচারের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে গল্পের আবহ। “থার্টি সিক্স আওয়ারস অফ বিট্রেয়াল”“গণলুটতন্ত্রী আওয়ামী সরকার” ডকুমেন্টারিতে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থলুণ্ঠনের নেপথ্যের বাস্তব চিত্র উঠে আসে।

তবে দর্শকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলে “আয়নাঘর ফাইলস” সিরিজের চারটি পর্ব—যথাক্রমে হুমাম কাদের, ব্যারিস্টার আরমান, সুখরঞ্জন বালিসাজেদুল ইসলাম সুমন-এর রহস্যজনক গুম ও নিখোঁজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত। এই চলচ্চিত্রগুলো দর্শকদের মাঝে এক গভীর মানবিক বোধ জাগিয়ে তোলে, যেখানে দেখা যায় কিভাবে একটি পরিবার প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণায় প্রতিদিন বেঁচে থাকে।

আরও প্রদর্শিত হয় “ট্রায়াল অফ জুলাই ম্যাসাকার”, “এমনকি লাশেরাও পায়নি রেহাই”, “সাদা জুব্বা : লাল রক্ত” এবং “উইল ইউ এভার স্লিপ, মা?”—যেগুলোর প্রতিটি ডকুমেন্টারিই সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানবতার গভীরতম ক্ষতগুলোকে সিনেমার ভাষায় তুলে ধরেছে।

প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, যাত্রাবাড়ী পার্ক, ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবর, বাহাদুর শাহ পার্ক, মিরপুর পল্লবীর হারুন মোল্লার মাঠ, উত্তরা ৩নং সেক্টরের মুক্তমঞ্চ, উত্তরা জমজম টাওয়ার, মোহাম্মদপুর টাউন হল মাঠ, হাতিরঝিল এম্ফিথিয়েটার এবং হাতিরঝিল (রামপুরা প্রান্ত)-এ। প্রতিটি স্থানে শত শত দর্শকের উপস্থিতি প্রমাণ করে, ইতিহাস ও বাস্তবতার মিশেলে নির্মিত এই ডকুমেন্টারিগুলো মানুষের অন্তরকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

দর্শকদের অনেকে জানান, এই ধরনের প্রদর্শনী শুধু সংস্কৃতির চর্চা নয়, বরং গণমানুষের চেতনা জাগানোর এক নতুন পথ। তারা বলেন, সত্য তুলে ধরার এই প্রয়াস রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাসের সঠিক ধারার সঙ্গে যুক্ত করবে।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চাই নতুন প্রজন্ম যেন ইতিহাস জানে, সত্য ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াতে পারে। চলচ্চিত্র এমন একটি মাধ্যম, যা মানুষের হৃদয়ে সরাসরি নাড়া দেয়।”

প্রদর্শনীর শেষে “জুলাইয়ে গান” শীর্ষক সঙ্গীতানুষ্ঠান পরিবেশন করেন কয়েকজন তরুণ শিল্পী। দেশপ্রেম, প্রতিবাদ ও মানবতার আহ্বানে ভরা সেই গানগুলো দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায়।

রাজধানীর এক দর্শক মন্তব্য করেন, “এই চলচ্চিত্রগুলো শুধু ডকুমেন্টারি নয়, এটি আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলার এক দৃশ্যমান দলিল।”

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় দমননীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে এই আয়োজনকে অনেকেই ইতিহাসের ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখছেন। সংস্কৃতি ও গণচেতনার এই সমন্বিত প্রয়াস যেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশে সত্য, ন্যায় ও মানবতার আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলতে থাকে—দর্শকদের এমন প্রত্যাশাই ছিল সারাদিনজুড়ে প্রতিধ্বনিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত