প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের আমন্ত্রণে আগামী ১৯ নভেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। তাঁর এ দু’দিনের সফরকে শুধু আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণই নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে গোপন বা ঘোষণাহীন হলেও সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার একটি নতুন জানালা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই সফরকে ঘিরে উভয় দেশেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে, বিশেষত বাংলাদেশে চলমান পরিবর্তনমান পরিস্থিতির কারণে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সরাসরি কথোপকথনের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে গেছে।
সূত্র নিশ্চিত করেছে যে খলিলুর রহমানের সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়েছে এবং তিনি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সম্মেলনে অংশ নিতে দিল্লি যাচ্ছেন। এই সম্মেলনটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নজরদারি, সন্ত্রাসবাদ দমন, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে সমন্বিত কৌশল নির্ধারণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং এর ফলে ছোট দেশগুলোর জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ায় এই ধরনের সম্মেলন আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশই দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, মানবপাচার ও চোরাচালান দমন, সামুদ্রিক নজরদারি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির এই সম্মেলনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুধু উপস্থিতি নয়, বরং এই সহযোগিতা আরও গভীর করার সম্ভাবনাও জোরালো হচ্ছে।
দিল্লিতে সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের একান্ত বৈঠক হবে কি না, তা নিয়ে এখনো সরকারি পর্যায়ে নিশ্চিত কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে—বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হওয়ার একটি বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “শতভাগ নিশ্চিত না হলেও, এমন উচ্চপর্যায়ের সফরে দুই উপদেষ্টার সাক্ষাৎ এড়িয়ে যাওয়া খুবই অসম্ভব।”
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতি নতুন করে সাজানো হচ্ছে। গত বছরের আগস্টে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে দ্বিতীয়বারের মতো কোনো উপদেষ্টার দিল্লি সফর। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ভারত সফর করেছিলেন ইন্ডিয়া এনার্জি উইকে অংশগ্রহণের মাধ্যমে, যেখানে দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই সফরটি ছিল মূলত জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কেন্দ্রিক। কিন্তু এবার খলিলুর রহমানের সফর নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি—দুই ক্ষেত্রেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ধারা পরিবর্তনের মধ্যেও এই সফরের তাৎপর্য বাড়ছে। রাজনৈতিক উত্তাপ, ভৌগোলিক বাস্তবতা, সীমান্ত ইস্যু, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সমসাময়িক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ—সবকিছু মিলিয়ে উভয় দেশই বর্তমানে অত্যন্ত সতর্ক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে মতবিনিময় শুধু প্রটোকল নয়, বরং নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি মূল্যবান পদক্ষেপ হতে পারে। বিশেষ করে ভারতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ শুধু প্রতিবেশী নয়, বরং সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্য রুট, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে বাংলাদেশের কাছে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি, যার সহায়তা ও সমন্বয় জরুরি হয়ে ওঠে বহু ক্ষেত্রে।
এদিকে দিল্লিতে আয়োজিত সম্মেলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হবে বলে মনে করছেন আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। কারণ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, জিরো টলারেন্স সন্ত্রাসবাদ নীতি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ শক্তিশালী করার পক্ষে কাজ করে আসছে। ভারতের সঙ্গে এই অবস্থান মিল থাকায় দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা বহু বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে বজায় রয়েছে।
যদিও খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সফর একা নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং আঞ্চলিক জোটগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান—এসব কিছুর সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ভারতের পক্ষেও দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও কৌশলগত সমন্বয় বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবমিলিয়ে খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরকে ঘিরে এখন দুই দেশেই কৌতূহল ও গুরুত্বের মাত্রা বেশি। তিনি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন, এটি নিশ্চিত। তবে সম্মেলনের বাইরেও গোপন বা আনুষ্ঠানিক বৈঠকের সম্ভাবনা যে নতুন বার্তা বয়ে আনতে পারে—তা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এই সফর আঞ্চলিক নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার পথে কতটা প্রভাব ফেলবে—তা এখন নজর রাখার বিষয়।