প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ব্যাংক খাত আবারও গুরুতর চাপের মুখে পড়েছে। লাগামহীন খেলাপি ঋণের বিস্তারে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা যখন নাজুক হয়ে উঠছে, তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল—আইএমএফ—বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, সেগুলোকে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই এসব ব্যাংককে হয় একীভূতকরণের আওতায় আনতে হবে, নয়তো অবসায়ন করতে হবে। এই কঠোর পরামর্শ দেশের ব্যাংক খাতে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইএমএফের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ঢাকায় সফররত প্রতিনিধিদলের সঙ্গে। বৈঠকে আইএমএফ প্রশ্ন তোলে, খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য প্রকাশে দেরি কেন হচ্ছে, ব্যাংকগুলো কীভাবে এত বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়লো, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কী ধরনের বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নেওয়া কয়েকটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরলেও আইএমএফের অবসায়ন-পরামর্শ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে এর প্রভাব পড়েছে পরপরই অনুষ্ঠিত আরেকটি বৈঠকে, যেখানে দেশের ৪৭টি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের ডেকে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছে।
এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদের সভাপতিত্বে। সেখানে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি জানিয়ে দেয়, ডিসেম্বরের মধ্যেই খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। পুনঃতফসিল, আইনগত ব্যবস্থা কিংবা অন্যান্য যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে, তার মধ্যে যে কোনো পথ গ্রহণ করে চূড়ান্ত সমাধানের দিকে এগোতে হবে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহযোগিতা করবে বলেও জানানো হয়। বৈঠকে থাকা কয়েকজন এমডি জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এটি দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ হার, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে দেশে এমন ১৬টি ব্যাংক রয়েছে, যাদের খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক ইতোমধ্যে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অথচ এই ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক বিবরণ বহু বছর ধরে গোপন ছিল। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম–দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বেড়ে ওঠার কারণে খেলাপি ঋণের সংখ্যা ভয়াবহভাবে বাড়তে থাকে। বিগত সরকার আমলে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই গ্রুপের নামে-বেনামে একাধিক ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে, যেগুলোর সঠিক জবাবদিহিতা ছিল না। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর এসব অনিয়ম একে একে প্রকাশিত হতে থাকে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করে। দেখা যায়, অনেক ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছে গেছে, পুঁজি ঘাটতি ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গেছে, আর গ্রাহকদের জমা ফেরত দিতে গিয়েও তারা হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক খাত সংস্কারের উদ্যোগ জোরদার করে। দুর্বল পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যাতে তাদের আর্থিক কাঠামো শক্তিশালী হয় এবং খেলাপি ঋণের চাপ কমে।
পাশাপাশি পুনঃতফসিলের সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দিয়ে নতুন সার্কুলার জারি করে। এর আগে নীতিসহায়তা কমিটির মাধ্যমে চার শতাধিক প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা পেয়েছিল। নতুন প্রক্রিয়ায় ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন করলে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণ নতুনভাবে সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও পুনঃতফসিল নীতিমালা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, তবে এটি খেলাপি ঋণ দীর্ঘমেয়াদে সমাধান করতে পারবে না যদি কাঠামোগত সংস্কার না আনা হয়।
এদিকে অবলোপন নীতিমালায়ও শিথিলতা আনা হয়েছে। আগে কোনো ঋণ অন্তত দুই বছর খেলাপি থাকার পর অবলোপন বা ‘রাইট-অফ’ করা যেত। এখন মাত্র ৩০ দিনের নোটিস দিলেই ‘মন্দ’ শ্রেণির খেলাপি ঋণও অবলোপন করা যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি, এর ফলে ব্যাংকগুলো কাগজে-কলমে ঋণের চাপ কমাতে পারবে এবং আর্থিক স্বাস্থ্য কিছুটা উন্নত দেখাতে পারবে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত সমস্যাগুলোকে আরও আড়াল করতে পারে।
আইএমএফের কঠোর অবস্থানের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা। খেলাপি ঋণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন সবই সংকটে পড়তে পারে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দুর্বল খাতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদি জবাবদিহিতা, নজরদারি এবং দক্ষতা বৃদ্ধি না পায়, তাহলে আরও ব্যাংক একীভূত বা বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতের গভীর সংকট এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক প্রভাবও ফেলছে। সাধারণ আমানতকারী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সকলেই আশঙ্কায় রয়েছেন। ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাজারে অস্থিরতা বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করা, অনিয়ম দমন করা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ কতটা ফলদায়ক হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে আইএমএফের স্পষ্ট বার্তা—সংকট মোকাবেলায় আর দেরি করার সময় নেই।