প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের জার্মানি, ইতালি ও গ্রিসভিত্তিক চারটি সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। অ্যান্টিফা আন্দোলনের সঙ্গে যোগসূত্র, রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িত থাকা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করার অভিযোগে এসব সংগঠনকে “বিশেষভাবে মনোনীত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী (SDGT)” ঘোষণা করা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ২০ নভেম্বর থেকে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
এই চারটি সংগঠন হলো—জার্মানির ‘অ্যান্টিফা অস্ট’, ইতালির ‘ইনফর্মাল অ্যানার্কিস্ট ফেডারেশন/ইন্টারন্যাশনাল রেভল্যুশনারি ফ্রন্ট (FAI/IRF)’, গ্রিসের ‘প্রোলেটারিয়ান জাস্টিস’ এবং ‘রেভল্যুশনারি ক্লাস সেলফ-ডিফেন্স’। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, সংগঠনগুলোর মধ্যে আদর্শিক মিল রয়েছে এবং তারা অ্যান্টিফা-সংলগ্ন বামপন্থী, অ্যানার্কিস্ট ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসাবে রাজনৈতিক সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে।
অ্যান্টিফা নিজে কোনো একক সংগঠন নয়; বরং এটি একটি বিকেন্দ্রিত আন্দোলন, যার শাখা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। ফ্যাসিবাদ, বর্ণবাদ এবং উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলাই আন্দোলনের মূল স্লোগান। তবে আন্দোলনের ভেতরে কিছু গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই সহিংস আন্দোলন, আগুন–বোমা হামলা বা সরকারি স্থাপনায় আক্রমণের অভিযোগে বিভিন্ন দেশের নজরে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বলছে—কিছু সংগঠন আদর্শিক ছত্রছায়ায় সহিংস উগ্রবাদের ধারায় ঢুকে পড়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও অনিরাপত্তা বাড়াচ্ছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায়, সংগঠনগুলোর সঙ্গে আর্থিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হবে। এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেউ যদি ওই সংগঠনগুলোর পক্ষে অর্থায়ন, লজিস্টিক সহায়তা বা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন—তবে তাকেও মার্কিন আইনের আওতায় শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে বলেছে, যারা এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ব্যবসা করবে, তারা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে থাকবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এসব সংগঠন শুধু ইউরোপেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সরকারের বিভিন্ন কাঠামোকে লক্ষ্য করে সাইবার হামলা, বোমা হামলা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতায় যুক্ত ছিল। অ্যানার্কিস্ট ও বিপ্লবী আদর্শে বিশ্বাসী সংগঠনগুলো বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো ভেঙে ফেলার চিন্তাভাবনায় অনুপ্রাণিত—এমন অভিযোগও বিবৃতিতে উঠে এসেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অ্যান্টিফাকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন বিক্ষোভে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অ্যান্টিফা-সংলগ্ন গোষ্ঠীর জড়িত থাকার অভিযোগে প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত জোরদার করে। গত সেপ্টেম্বরে দেশটির অভ্যন্তরেও অ্যান্টিফাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নতুন ঘোষণায় ইউরোপীয় সংগঠনগুলোকেও একই তালিকায় যুক্ত করা হলো।
সন্ত্রাসবিরোধী আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিফার বিকেন্দ্রিক প্রকৃতির কারণে আইন প্রয়োগ ও সংজ্ঞায়ন কঠিন হতে পারে। আন্দোলনের ভেতরে একেকটি গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য, কাঠামো বা কার্যক্রম এক নয়। তাই যেসব সংগঠনকে সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের আলাদা করে প্রমাণ-ভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হবে—এই ব্যাখ্যাও মার্কিন প্রশাসন দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিফা আন্দোলনের সমর্থকদের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা মানবাধিকার আন্দোলনে যুক্ত থাকলেও অপর একটি অংশ সহিংস রাজনৈতিক নাশকতার পথ বেছে নিয়েছে; ফলে পৃথকীকরণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, সমালোচকেরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে, কারণ অ্যান্টিফা সাধারণত ডানপন্থী রাজনীতির বিরোধী। ফলে বামপন্থী আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যও এতে থাকতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি—এটি কোনো আদর্শিক লড়াই নয়; বরং আন্তর্জাতিক সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলার অংশ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সিদ্ধান্তের প্রভাবও কম নয়। ইউরোপীয় সংগঠনগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা মানে—তাদের সদস্য, সমর্থক ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিভিন্ন দেশের নজরদারির আওতায় আসবে। ব্যাংক লেনদেন থেকে শুরু করে যাতায়াত, সম্পদ অধিগ্রহণ—সব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ হতে পারে। ফলে সংগঠনগুলোর যোগাযোগ, সমন্বয় ও কার্যক্রম পরিচালনা আরও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষিত হবে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী নীতিমালা এখন আরও বিস্তৃত ও জটিল হয়ে উঠছে। কোনো দেশের রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা প্রতিবাদ সংগঠন যদি আন্তর্জাতিকভাবে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তা হলে সেই দেশের নীতিনির্ধারণ, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং অর্থনৈতিক খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, অর্থপ্রবাহ ও আইনগত যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নতুন সতর্কতা যুক্ত হতে পারে।
অনেক মানবাধিকার সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে। তাদের মতে, আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের সবাই সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত নয়; বরং অনেকেই সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে সক্রিয়। তাই আন্দোলনের পেছনের বিস্তৃত রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনা না করেই সন্ত্রাসী তকমা দিলে মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সংগঠিত প্রতিরোধের অধিকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—সহিংসতার হুমকি বাস্তব, এবং বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক উগ্রবাদ যে শুধু এক দিকে সীমাবদ্ধ নয়, তা নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে এই সিদ্ধান্ত।
শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক আদর্শ বা মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমনসব আন্দোলনের দিকেই কঠোর হচ্ছে, যেগুলো সহিংসতার পথে হাঁটে বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ইউরোপীয় এই চারটি গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী তালিকায় যুক্ত করার সিদ্ধান্তও সেই নীতি-অবস্থান স্পষ্ট করে।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে আগামী ২০ নভেম্বর থেকে। সে দিন থেকেই সংগঠনগুলো মার্কিন আইনে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে গণ্য হবে, এবং বিশ্বব্যাপী তাদের ওপর নজরদারি আরও কঠোর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।