প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দুই শতাধিক বছর ধরে তৈরি হওয়া এক সেন্ট মুদ্রা বা পেনি শেষবারের মতো তৈরি হচ্ছে। ফিলাডেলফিয়ার টাকশালে বুধবার শুরু হয়েছে পেনির সর্বশেষ ব্যাচের উৎপাদন। ১৭৯৩ সালে প্রথমবারের মতো পেনি মুদ্রা তৈরি করা হয়েছিল, যা তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে যুগের পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পেনির উৎপাদন বন্ধ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, অর্থ সাশ্রয় এবং মুদ্রার কার্যকারিতা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তামার প্রলেপযুক্ত দস্তায় তৈরি পেনি মুদ্রায় রয়েছে গৃহযুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের ছবি। বর্তমানে একটি পেনি তৈরি করতে চার সেন্ট খরচ হয়, যা দশ বছর আগেও এর অর্ধেকের কম ছিল। অর্থ বিভাগ আশা করছে, উৎপাদন বন্ধের ফলে বছরে প্রায় পাঁচ কোটি ৬০ লাখ ডলার সাশ্রয় হবে।
মুদ্রা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভার্চুয়াল লেনদেনের বাড়বাড়ন্ত এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে পেনির প্রয়োজনীয়তা দিন দিন কমছে। বর্তমানে মার্কিন বাজারে প্রায় ৩০ হাজার কোটি পেনি মুদ্রা রয়েছে, যা ব্যবহারিক চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। ২০২২ সালের সরকারি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পেনির প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় নেই এবং মূলত শিশুদের মাটির ব্যাংক বা সঞ্চয় ব্যাংকে স্থান পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পেনির উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ফলে সামান্য জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ এক ধরনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করছে, যেখানে নগদ অর্থের ব্যবহার ক্রমেই কমে যাচ্ছে এবং ডিজিটাল লেনদেন বা অনলাইন পেমেন্ট পদ্ধতি দৌলতে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে।
পেনি একটি ছোট মুদ্রা হলেও এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব কম নয়। প্রায় ২৩৫ বছরের ইতিহাসে এটি এমন একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমেরিকান জীবনের সাথে জড়িয়ে ছিল। সেই সঙ্গে এটি লিঙ্কনের স্মৃতি এবং দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বিশ্বের অন্যান্য দেশও তাদের ক্ষুদ্রতম মুদ্রার উৎপাদন বন্ধ করেছে। কানাডা ২০১২ সালে তাদের সর্বশেষ এক সেন্ট মুদ্রা তৈরি করে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে এক ও দুই সেন্ট মুদ্রার উৎপাদন ১৯৯০ সালের দিকে শেষ হয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নগদ অর্থের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল বিকল্প এবং ক্ষুদ্র মুদ্রার ব্যয়বহুল উৎপাদনের কারণে এই ধরনের পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে সাধারণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পেনি এখন কম ব্যবহৃত হলেও এটি অর্থনৈতিক এবং ইতিহাসগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দৈনন্দিন লেনদেনে ব্যবহার না হলেও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানিক হিসাবরক্ষায় পেনি মুদ্রার ভূমিকা ছিল দীর্ঘদিন। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, মুদ্রার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর পেনি সরবরাহ থাকবে, তবে নতুন মুদ্রা আর তৈরি হবে না।
এতে সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব পড়বে না, তবে কয়েক বছরের মধ্যে ছোট খুচরা লেনদেনে ডিজিটাল অর্থ বা রাউন্ডিং পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা বাড়বে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন, যেখানে নগদ অর্থের ব্যবহার ক্রমেই কমে যাচ্ছে এবং ডিজিটাল অর্থনীতি প্রধান হয়ে উঠছে।
সামগ্রিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত মুদ্রা উৎপাদন, খরচ এবং অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা যায়। পেনির ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা প্রায় দুইশ’ বছরের যাত্রার শেষ মুহূর্তকে চিহ্নিত করছে।
ফিলাডেলফিয়ার টাকশালে পেনির উৎপাদন শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটছে। আর্থিক ও ইতিহাসবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক হিসাবের বিষয় নয়, এটি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্মৃতিও বহন করে। পেনি মুদ্রা আজও মানুষের স্মৃতিতে একটি বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে, যা ভাঙা না গেলেও আর নতুন প্রজন্মের হাতে আর তৈরি হবে না।
পরিশেষে বলা যায়, এই ছোট মুদ্রার উৎপাদন বন্ধ হওয়া অর্থনৈতিক দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বয় ঘটানোর পদক্ষেপ। ডিজিটাল লেনদেনের দৌলতে নগদ অর্থের ব্যবহার কমে গেছে, আর পেনি তার দীর্ঘ ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটিয়ে নতুন অর্থনৈতিক যুগের সূচনা করছে।