প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়ল এবং তার দুই জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ উঠে এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে, তারা গোপনে ড্রোন পাঠিয়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনকে উত্ত্যক্ত করতে চেয়েছিলেন। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে দেশের মধ্যে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করা এবং তার অজুহাতে মার্শাল ল বা সামরিক শাসন জারি করার পথ প্রশস্ত করা। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসিকিউটররা এই তথ্য প্রকাশ করেছেন।
প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, একটি ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার ফোনে পাওয়া নোট এবং মেমোতে দেখা গেছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং তার সহযোগীরা এমনভাবে কিমকে উসকে দিতে চেয়েছিলেন যাতে উত্তর কোরিয়া সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। নোটে পিয়ংইয়ং, পারমাণবিক স্থাপনা, কিমের ছুটির বাড়ি, সামজিয়ন ও ওয়ানসানকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সামজিয়ন কিম জং ইলের জন্মস্থান হিসেবে বিশেষ পবিত্র বলে বিবেচিত হয়, আর ওয়ানসান কিম জং–উনের বড় পর্যটন প্রকল্প। নোটগুলোতে বলা হয়, ‘কমপক্ষে জাতীয় নিরাপত্তা সংকট, আর বেশি হলে নোয়ার বন্যার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে’ এবং ‘শত্রুর কোনো পদক্ষেপ আগে হওয়া উচিত, সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে।’
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা থাকত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত যা দ্রুত বড় আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারত, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও। কারণ দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং সেখানে হাজার হাজার মার্কিন সৈন্য মোতায়েন। এছাড়া ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তিও লঙ্ঘিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, এই পরিকল্পনা মূলত ২০২৩ সালের অক্টোবরের দিকে শুরু হয়েছিল, যখন দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীতে বড় রদবদল করা হয়। ওই সময় গোপনে উত্তর কোরিয়ার ভেতরে সরকারবিরোধী প্রচারপত্র ফেলেছিল বলে অভিযোগ আসে, যা পরবর্তীতে কিম জং–উনের বোন কিম ইয়ো জং তীব্র ভাষায় নিন্দা জানিয়েছিলেন।
ইউন সুক ইয়ল ও তার সহযোগীরা রাষ্ট্রের ক্ষতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শত্রুকে সাহায্য করার অভিযোগে বিচারাধীন। তারা ৩ ডিসেম্বর রাতে মার্শাল ল জারি করেছিলেন। এর ফলে সেনারা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে পার্লামেন্ট ভবন এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করেন, কিন্তু পার্লামেন্ট সদস্য ও সাধারণ নাগরিকরা দরজা আটকে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই বিশৃঙ্খলার দৃশ্য সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়। শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্টের মধ্যে ভোটাভুটি করে মার্শাল ল বাতিল করা হয় এবং দেশজুড়ে বড় বিক্ষোভ শুরু হয়।
ইউন ও তার আইনজীবীরা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, অভিযোগ একপক্ষীয় এবং আইনি ভিত্তিহীন। তবে প্রসিকিউটররা এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা জানান, এমন পরিকল্পনা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা বলেন, ড্রোন পাঠানো হলেও উত্তর কোরিয়ার সামরিক প্রতিক্রিয়া না দেখানো ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য সৌভাগ্য, কারণ তা সংঘর্ষকে প্রতিহত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মন্তব্য করেছেন, যদি উত্তর কোরিয়া তখনই প্রতিক্রিয়া দেখাত, তা একটি বড় দ্বিপাক্ষিক সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারত। এই ধরনের পরিকল্পনা কেবল দেশীয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করত, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলত। যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলেও এর প্রভাব পড়ত।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তার দুই সহযোগী আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শত্রুকে সহায়তার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি। এই মামলাটি কেবল দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক শান্তি ও সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে একটি সতর্কতামূলক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়লের গোপন ড্রোন পরিকল্পনা দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। এটি প্রমাণ করে যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতাদের কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং জনসাধারণের জীবন-জীবিকা কতটা প্রভাবিত হতে পারে।