প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইন্দোনেশিয়ার মধ্য জাভা প্রদেশে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট ভূমিধসে অন্তত দুইজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দেশটির স্থানীয় কর্তৃপক্ষ শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সিলাকাপ জেলার তিনটি গ্রামে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এই ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে তিনটি গ্রামের অনেক বাড়িঘর মাটির নিচে চাপা পড়ে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করেছে।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মুখপাত্র আবদুল মুহারি শুক্রবার সকালে জানান, ভূমিধসের পর উদ্ধারকর্মীরা জরুরি ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ২৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু, এখনও ২১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। মুহারি বলেন, “ভূমিধসের কারণে মাটির নিচে ধ্বংসস্তূপ এবং স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা উদ্ধারকাজে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। উদ্ধারকর্মীরা সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছেন, তবে ঝুঁকি এখনও অনেক বেশি।”
স্থানীয় প্রশাসন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি সাহায্য পৌঁছে দিয়েছে। তারা খাবার, পানি, ওষুধ এবং সাময়িক আশ্রয় সামগ্রী সরবরাহ করছে। তবে ভূমিকম্প বা ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাছাড়া অতিবৃষ্টির কারণে নতুন ভূমিধসের আশঙ্কা থাকায় উদ্ধারকাজে চ্যালেঞ্জের মাত্রা আরও বেড়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া বিভাগ সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে মধ্য জাভা এবং দেশের অন্যান্য কিছু অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিপাত হতে পারে। তারা নাগরিকদের নদী, খাল ও পাহাড়ি এলাকা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই বন্যা এবং ভূমিধসের ঘটনা ঘটে, যা দেশের জলবায়ু ও ভৌগোলিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইন্দোনেশিয়ার জনসংখ্যা ঘনত্ব এবং দ্বীপপুঞ্জের ভূপ্রকৃতির কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব খুবই বিস্তৃত। দেশটি ১৭ হাজার দ্বীপ নিয়ে গঠিত, যেখানে অনেক মানুষ পাহাড়ি এলাকা বা প্লাবনভূমির কাছাকাছি বসবাস করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষার তীব্রতা এবং সময়কাল আগের তুলনায় আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তন শুধু বৃষ্টিপাতের মাত্রা বাড়ায় না, বরং ভূমিধসের আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
এ মাসের শুরুতে দেশের দূরবর্তী পাপুয়া অঞ্চলেও আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে অন্তত ১৫ জন নিহত এবং ৮ জন নিখোঁজ হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইন্দোনেশিয়ার মতো দ্বীপপুঞ্জ দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জটিল। পাহাড়ি এলাকা এবং নদী তীরবর্তী অঞ্চলে অবাধ নির্মাণ, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভূমিধসের ঝুঁকি ক্রমবর্ধমান।
স্থানীয় প্রশাসন ভূমিকম্প ও ভূমিধসের ঝুঁকি মোকাবেলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নতি, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিসংরক্ষণ, নদী ও খাল সংস্কার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। তবে এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেয়া এখনও চ্যালেঞ্জিং।
অভিযানকারী দল জানিয়েছে, জীবিতদের উদ্ধার করার পর তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হবে। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর, তাই চিকিৎসা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হয়েছে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা উদ্ধারকর্মীদের সহায়তা করছে, তবে বিপজ্জনক অঞ্চলে প্রবেশের সময় সতর্কতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিও এই দুর্যোগ মোকাবেলায় সাহায্য করার প্রস্তুতি নিয়েছে। মানবিক সাহায্য ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের জন্য স্থানীয় সরকার, এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তারা আশঙ্কা করছে, যদি আগামীদিনে আরও প্রবল বৃষ্টিপাত হয়, তবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়তে পারে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
ভূমিধসের এই ঘটনা ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকদের জন্য একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং ঝুঁকি কমানোর জন্য অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। স্থানীয় সম্প্রদায়কে প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলায় প্রস্তুত করতে শিক্ষা, সচেতনতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য।
এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও এলাকাবাসীকে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, তাদের পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ প্রতিরোধের পরিকল্পনা গ্রহণ করা ইন্দোনেশিয়ার সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও তাত্ক্ষণিক মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।