প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ থিয়েটার মহোৎসব—এশিয়া-প্যাসিফিক বন্ড অব থিয়েটার স্কুলস ফেস্টিভ্যাল অ্যান্ড ডিরেক্টর্স’ কনফারেন্স ২০২৫–এ বাংলাদেশের পতাকা উড়াতে যাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসরাফিল শাহীন। আগামী ২৮ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত চীনের সাংহাই থিয়েটার অ্যাকাডেমিতে সপ্তাহব্যাপী এই আয়োজন বসতে যাচ্ছে। আঞ্চলিক নাট্যশিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি-বিনিময় ও শিল্প–সৃজনের সমন্বয়ে এটি আন্তর্জাতিক থিয়েটার জগতের এক বিশিষ্ট আলোচনার মঞ্চ। শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, শিল্পী ও পেশাদার থিয়েটার নির্মাতাদের সমন্বয়ে এশিয়া–প্যাসিফিকের ২৫টিরও বেশি দেশ অংশ নেবে এ আসরে। সেই বৃহৎ আয়োজনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে একজন দক্ষ গবেষক ও অভিজ্ঞ শিল্প-ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য নিঃসন্দেহে এক সম্মানের ঘটনা।
অধ্যাপক ইসরাফিল শাহীন দীর্ঘদিন ধরে থিয়েটার গবেষণা, পারফরম্যান্স, শিক্ষা ও শিল্প-চর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে কারা থিয়েটার, কিশোর সংশোধনাগারে থিয়েটার, মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে থেরাপিউটিক থিয়েটার—এই তিনটি ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে তার গবেষণা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সাংস্কৃতিক প্রয়োগ, মানবিক উন্নয়ন ও মনস্তাত্ত্বিক পুনর্বাসনে থিয়েটারের ভূমিকা নিয়ে তার ভাবনা ও অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। সাংহাইতে অনুষ্ঠিতব্য এ উৎসবে তিনি উপস্থাপন করবেন তার বহু বছরের গবেষণার ফলাফল এবং বাংলাদেশের প্রসঙ্গনির্ভর থিয়েটার পরিমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য।
এ উৎসবে তার অন্যতম কেন্দ্রীয় ভূমিকা থাকবে কিনোট বক্তা হিসেবে। পাশাপাশি তিনি পরিচালনা করবেন থিয়েটার বিষয়ক কর্মশালা, উচ্চতর প্রশিক্ষণমূলক মাস্টারক্লাস, একাডেমিক সেমিনার এবং শিল্প–সংশ্লিষ্ট সিম্পোজিয়াম সেশন। অংশগ্রহণকারীদের সামনে তিনি তুলে ধরবেন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, মানবিক সংকট ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে থিয়েটারের সংযোগস্থলগুলো। বিশেষ করে কারাগারের বন্দিদের মানসিক পুনর্বাসনে থিয়েটারের প্রয়োগ—যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি নতুন কিন্তু বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র—এই বিষয়ে তার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশের গবেষক ও শিল্পীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ভিত্তি হয়ে উঠবে।
এশিয়া-প্যাসিফিক বন্ড অব থিয়েটার স্কুলস হলো ইউনেস্কো–আইটিআই-এর সহযোগিতায় গঠিত একটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক, যা ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় থিয়েটার শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে। সাংহাই থিয়েটার অ্যাকাডেমি এই নেটওয়ার্কের নিয়মিত আয়োজক এবং এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ থিয়েটার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালে তাদের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে উৎসবটি বিশেষ আয়োজনে রূপ পেয়েছে, যেখানে থিয়েটার শিক্ষার ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা নিয়ে থাকবে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা। শিল্পী ও শিক্ষকদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা নিজেদের পারফরম্যান্স, নতুন নাট্যরীতির প্রয়োগ এবং দেশি–বিদেশি মঞ্চ পরিকল্পনার অভিজ্ঞতা বিনিময় করার সুযোগ পাবে।
এই উৎসবে অংশ নিতে আসবে চীন, ভারত, জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইনসহ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রায় সব প্রধান থিয়েটার স্কুল। প্রতিটি দেশ তাদের বিশেষ থিয়েটার পরিচয় উপস্থাপন করবে স্টেজ-শো, মাস্টারক্লাস এবং গবেষণা-উপস্থাপনার মাধ্যমে। পারফরম্যান্স, নির্দেশনা, স্টেজ টেকনোলজি, মুভমেন্ট থিয়েটারসহ বিভিন্ন বিষয়ে থাকবে উন্নতমানের প্রশিক্ষণ। অংশগ্রহণকারীদের জন্য এটি হবে নতুন নাট্যরীতি, পদ্ধতি ও ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক দুর্লভ সুযোগ।
অধ্যাপক ইসরাফিল শাহীনের অংশগ্রহণ এ উৎসবে বাংলাদেশের থিয়েটারশিক্ষা ও গবেষণার আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। দীর্ঘ দিন ধরে তিনি দেশের থিয়েটার শিক্ষার আধুনিক কাঠামো নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নাট্যশিক্ষাকে বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত করা, মাঠপর্যায়ে থিয়েটারকে মানুষের জীবনের অংশ করে তোলা এবং সমাজভিত্তিক সৃজনশীল চর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার অগ্রদূত তিনি। তাই শাংহাইয়ের এই আন্তর্জাতিক থিয়েটার আসরে তার অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য নতুনতর গবেষণা, নতুন শিল্পচর্চা ও নতুন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ খুলে দিতে পারে।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো দেশের জন্যই এ প্রতিনিধিত্ব একটি বড় অর্জন। বাংলাদেশের থিয়েটারের দীর্ঘদিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জনপ্রিয়তার উত্থান-পতন, নাট্যদলের সৃজনশীল অবদান এবং গ্রামীণ মঞ্চসংস্কৃতির ঐতিহ্য—এসবই এ উৎসবের মাধ্যমে নতুন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন হবে। এতে করে দেশের থিয়েটার অঙ্গন নিজেদের সৃজনশীল শক্তিকে আরও সুসংহত করতে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়াতে উৎসাহিত হবে।
আন্তর্জাতিক থিয়েটার অঙ্গনে নতুন সম্পর্ক তৈরি, গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন, বাংলাদেশের শিল্প-চর্চার বৈশ্বিক স্বীকৃতি—সব মিলিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক বন্ড অব থিয়েটার স্কুলস ফেস্টিভ্যালে অধ্যাপক ইসরাফিল শাহীনের অংশগ্রহণ দেশের থিয়েটার জগতে নতুন আলো, নতুন প্রত্যাশা এবং নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে যাচ্ছে। দেশের শিল্প-সৃজন, শিক্ষা ও গবেষণার পরিসর তাই আরও সম্প্রসারিত হবে—এ উৎসব থেকে ফিরে তার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে নতুন প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠবে অনুপ্রেরণার উৎস।