রুদ্ধশ্বাস টাইব্রেকারে জয়, শেষ ষোলোতে ব্রাজিল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৩ বার
রুদ্ধশ্বাস টাইব্রেকারে জয়, শেষ ষোলোতে ব্রাজিল

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাকার্তার রাত তখনো পুরোপুরি নেমে আসেনি। আকাশে হালকা বাতাস, স্টেডিয়ামের চারপাশে জমায়েত হাজারো দর্শকের মৃদু গুঞ্জন, আর মাঠের ভেতরে শুরুতেই ব্রাজিলের ওপর নেমে আসা চাপ—সব মিলিয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২ এর ম্যাচটি ছিল শুরু থেকেই উত্তেজনায় ঠাসা। কিন্তু ম্যাচের যে চিত্র ফুটে উঠেছিল, তা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কেউই অনুমান করতে পারেনি। একদিকে দশজনের দলে পরিণত হওয়া ব্রাজিল, অন্যদিকে ধীরে ধীরে তাল ফিরে পাওয়া প্যারাগুয়ে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর অবশেষে এক নাটকীয় টাইব্রেকারের মাধ্যমে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নেয় ব্রাজিল। গোলরক্ষক জোয়াও পেদ্রোর দুর্দান্ত নৈপুণ্য আর লুইস পাচেকোর শেষ শটের নিখুঁত সফলতায় প্যারাগুয়েকে ৫-৪ ব্যবধানে হারিয়ে সেলেসাওরা উৎসবে মেতে ওঠে।

ম্যাচের শুরুর দশম মিনিটেই যে ধাক্কা নেমে আসে ব্রাজিলের ওপর, তা দলটির সমর্থকদের জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন মুহূর্ত। ডিফেন্ডার ভিতোর হুগো সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ব্রাজিলকে বাকি ম্যাচ খেলতে হয় এক খেলোয়াড় কম নিয়ে। অনূর্ধ্ব-১৭ দলের মতো তরুণ ও চাপের মুহূর্তে অভিজ্ঞতা-স্বল্প খেলোয়াড়দের জন্য এমন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ। মাঠে তখনো ৮০ মিনিটের বেশি খেলা বাকি—একজন খেলোয়াড় কম নিয়ে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে টিকে থাকা ছিল কল্পনাতীত কঠিন। কিন্তু মাঠে যে ব্রাজিল দলটি দেখা গেল, তারা যেন অন্য এক সত্তা। শৃঙ্খলা, দৃঢ়তা আর দারুণ গতিতে আক্রমণ সাজিয়ে তারা প্রথমার্ধেই গোলের বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করে।

প্যারাগুয়ে অবশ্য শুরুতে কিছুটা চাপে থাকলেও ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে। প্রথমার্ধে তাদের আক্রমণগুলো খুব একটা ধারালো না হলেও ব্রাজিলের চাপে তারা নিজেদের রক্ষণ গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করে। তবে বিরতি থেকে ফিরে প্যারাগুয়ে যেন নতুন উদ্যমে মাঠে নামে। দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে তারা আঁটসাঁট পাসিং, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক আর উইং দিয়ে চাপ তৈরি করে ব্রাজিলকে রক্ষণে ব্যস্ত করে তোলে। এমনকি এক পর্যায়ে তাদের স্ট্রাইকারের শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসায় গোলশূন্য ব্যবধানই বজায় থাকে। ব্রাজিলের সমর্থকদের হৃদস্পন্দন যেন মুহূর্তেই বেড়ে যায়। দশজনের দল হিসেবে আরেকটি গোল হজম করলে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল আরও কম।

দুই দলেরই কিছু মুহূর্তে গোল পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলের দেখা মেলেনি। এরপরই শুরু হয় ফুটবলের সবচেয়ে চাপের পরীক্ষা—টাইব্রেকার। যেখানে একটি শটই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে, আবার একটি সেভ বদলে দিতে পারে পুরো প্রতিযোগিতার চিত্র। টাইব্রেকারের প্রথম পাঁচ শটে দুই দলই দুর্দান্ত লড়াই করে। স্নায়ুচাপ সামলে তারা ঠাণ্ডা মাথায় শট নিতে থাকে, এবং পাঁচটি শট শেষে দুই দলই ৪-৪ সমতায় দাঁড়ায়। স্টেডিয়ামের দর্শকদের শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসে। আর তখনই শুরু হয় সাডেন ডেথ।

এবার মঞ্চে হাজির হন ম্যাচের প্রকৃত নায়ক—ব্রাজিল গোলরক্ষক জোয়াও পেদ্রো। প্যারাগুয়ের প্রথম সাডেন ডেথ শটটি তিনি চমৎকার দক্ষতায় ঠেকান। তখনো কিছুই শেষ হয়নি, কারণ ব্রাজিলের শটেও গোল না হলে আবার সমতায় ফিরতে পারত উভয় দল। ব্রাজিলের পরের শটেও গোল না হওয়ায় সমতা অটুট থাকে। এরপর আসে প্যারাগুয়ের পরবর্তী শট—আবারও পেদ্রোর অদম্য প্রতিরোধ। অসাধারণ পজিশনিং এবং সঠিক দিক অনুমান করার নিখুঁত ক্ষমতায় দ্বিতীয়বারের মতো শট ঠেকিয়ে তিনি দলের নায়ক হয়ে ওঠেন। এরপর লুইস পাচেকোর শটটি যখন জালের ভেতর গিয়ে জড়ায়, তখন ব্রাজিলের ডাগআউটে, মাঠে এবং স্টেডিয়ামের গ্যালারির ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মাঝে সৃষ্টি হয় আনন্দের বিস্ফোরণ। দীর্ঘ ১৪ শটের টাইব্রেকারের উত্তেজনা শেষে ব্রাজিলের তরুণরা উঠে যায় শেষ ষোলোতে।

এবার তাদের প্রতিপক্ষ ফ্রান্স—যারা গ্রুপপর্ব এবং নকআউটের প্রথম ধাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে এসেছে। কলম্বিয়াকে হারিয়ে ফ্রান্স যখন শেষ ষোলো নিশ্চিত করে, তখন থেকেই বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রান্স ও ব্রাজিলের ম্যাচটি হতে পারে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে উপভোগ্য দ্বৈরথগুলোর একটি। দুই দলের ইতিহাস, ফুটবল দর্শন আর আক্রমণভিত্তিক কৌশলই ম্যাচটিকে করে তুলবে অনন্য এক লড়াই।

অন্যদিকে রাউন্ড অব ৩২-এর অন্যান্য ম্যাচগুলোতেও উত্তেজনা কম ছিল না। রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড কানাডাকে হারিয়ে পরের রাউন্ডে জায়গা করে নেয়। আর্জেন্টিনা হেরে যায় মেক্সিকোর কাছে, যা ছিল দিনের বড় চমক। মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে আরও একবার প্রমাণ করে আফ্রিকান ফুটবলের উত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জাম্বিয়াকে হারিয়ে মালি এগিয়ে যায় পরের রাউন্ডে, বেলজিয়ামকে হারায় পর্তুগাল, আর মিশরকে হারিয়ে সুইজারল্যান্ড প্রমাণ করে তাদের ফুটবলও এখন বিশ্ব মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো শক্তিশালী।

এই টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত দল কলম্বিয়া বিদায় নেয় ফ্রান্সের কাছে হেরে। কলম্বিয়ার ফুটবল সবসময়ই তরুণ প্রতিভায় ভরপুর, কিন্তু ফরাসি আক্রমণভাগের কাছে তাদের রক্ষণ আজ থেমে যায়। একই দিনে পরপর ঘটে যাওয়া এসব ম্যাচ টুর্নামেন্টকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলে। প্রতিটি দলই নিজের সামর্থ্যের সেরা প্রদর্শন নিয়ে মাঠে নামছে এবং তরুণ ফুটবলারদের লড়াই জমে উঠছে নতুন প্রজন্মের ফুটবল প্রতিভা খুঁজে বের করার বড় মঞ্চে।

ব্রাজিলের এই জয় প্রমাণ করে যে ফুটবল কখনো কখনো শুধু দক্ষতার নয়, মানসিক শক্তি এবং দলগত ঐক্যেরও খেলা। দশজন হয়েও ৮০ মিনিট টিকে থাকা, তারপর টাইব্রেকারে অসাধারণ সাহস দেখানো—তরুণ ব্রাজিল দলকে এই লড়াই আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। গোলরক্ষক জোয়াও পেদ্রোর পারফরম্যান্স ফুটবলবিশ্বে আলোচনায় থাকবে অনেকদিন। তার ঠান্ডা মাথা, নিখুঁত টেকনিক আর দৃঢ় মনোভাবই ব্রাজিলের শেষ ষোলো নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।

ব্রাজিল-ফ্রান্স ম্যাচটি এখন নজর কাড়বে সবার। দুই ফুটবল পরাশক্তির তরুণ দল মুখোমুখি হবে এমন এক লড়াইয়ে, যেখানে টিকে থাকার লড়াইয়ের পাশাপাশি থাকবে গর্ব, ঐতিহ্য আর ভবিষ্যৎ তারকা তৈরির বড় সুযোগ। ব্রাজিলের এই জয় যে তাদের সেমিফাইনালের স্বপ্নকেও জিইয়ে রাখবে, তা নিশ্চিত।

ফুটবলপ্রেমীরা এখন অপেক্ষায়—আরেকটি রুদ্ধশ্বাস ম্যাচের, যেখানে হয়তো আবার জন্ম নেবে নতুন এক নায়ক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত