প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান শনিবার সকাল থেকেই যেন রূপ নিয়েছিল এক ভিন্ন আবহে। ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষের ঢল নামতে শুরু করে উদ্যানমুখী সড়কগুলোতে। কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়ত মহাসম্মেলন’-এ যোগ দিতে মানুষের এই স্রোত সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও ঘন হতে থাকে। সকাল নয়টার পর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই মহাসম্মেলন ঘিরে উদ্যানজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর এক আবহ, তবে তার মধ্যেও ছিল গভীর ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসের অনুরণন।
সম্মিলিত খতমে নবুওয়ত পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এই মহাসম্মেলন ইতোমধ্যেই দেশের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়েছে। দেশি-বিদেশি অসংখ্য আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদদের সমাবেশ হওয়ায় অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু মানুষের মধ্যে ছিল গভীর আগ্রহ। সারা দেশ থেকে আসা অংশগ্রহণকারীরা সকালে আসন গ্রহণের আগেই পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পূর্ণ হয়ে যায়। দূরদূরান্ত থেকে আগত ধর্মপ্রাণ মানুষের হাতে দেখা যায় ব্যানার, পোস্টার ও তাওহিদ-নবুওয়ত রক্ষার শ্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড, যার প্রতিটি তাদের বিশ্বাস ও দাবি প্রকাশের দৃঢ়তা বহন করছিল।
মহাসম্মেলনের সভাপতিত্ব করছেন টাঙ্গাইলের মধুপুরের পীর মাওলানা আব্দুল হামিদ। তার নেতৃত্বে সকাল থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ের আলেমদের বক্তব্য উপস্থাপন শুরু হয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে উজ্জীবিত মানুষের সামনে আলেমরা নবুওয়ত রক্ষার গুরুত্ব, কাদিয়ানী মতবাদের ভ্রান্তি এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। মঞ্চে বক্তব্য দিতে থাকা অধিকাংশ বক্তাই বলেন, মুসলমানদের ঈমানী দাবি রক্ষা এবং খতমে নবুওয়তের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টি কেবল বাংলাদেশের নয়, পুরো মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের দাবি।
এই মহাসম্মেলনে যোগ দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন খ্যাতনামা ওলামা-মাশায়েখ ও আন্তর্জাতিক ইসলামি চিন্তাবিদরা। বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের সভাপতি মাওলানা ফজলুর রহমান। তার উপস্থিতি মঞ্চে উঠতেই জনতার মধ্যে দেখা যায় উচ্ছ্বাস। পাকিস্তান, ভারত, সৌদি আরব, মিশরসহ বিভিন্ন দেশের ওলামাদের অংশগ্রহণে মহাসম্মেলনটি আন্তর্জাতিক বৈচিত্র্য পায়, যা দেশের ইসলামী অঙ্গনে এক অনন্য বার্তা দেয়।
উপস্থিত ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের প্রিন্সিপাল মুফতি আবুল কাসেম নোমানী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষায় ও চিন্তাধারায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছেন। এছাড়া ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা মাহমুদ মাদানী, যিনি ভারতসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পরিচিত নাম। সৌদি আরব থেকে আগত ইন্টারন্যাশনাল খতমে নবুওয়ত মুভমেন্টের নেতৃস্থানীয় আলেম শায়েখ আব্দুর রউফ মাক্কীর উপস্থিতি সমাবেশকে আরেক ধাপ গুরুত্ব দিয়েছে। মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শায়েখ মুসআব নাবীল ইবরাহীম এবং পাকিস্তানের বিশিষ্ট দাঈ ও ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা ইলিয়াস গুম্মানসহ আরও অনেকে এই সম্মেলনকে আন্তর্জাতিক ইসলামী মেধা ও অভিজ্ঞতার মিলনমেলায় পরিণত করেছেন।
দেশের শীর্ষ ওলামাদের মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বক্তব্য রাখছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির মাওলানা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী, যিনি অমুসলিম মতবাদ প্রতিহত করার প্রশ্নে বহুদিন ধরে সুস্পষ্ট অবস্থানের জন্য পরিচিত। চট্টগ্রামের দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর প্রিন্সিপাল মাওলানা খলিল আহমাদ কুরাইশী মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, মুসলমানদের আকিদা রক্ষার যে সংগ্রাম, তা যুগের পর যুগ ধরে চলে এসেছে। বর্তমান সময়েও সেই সংগ্রাম একই গুরুত্ব বহন করে। আল হাইয়াতুল উলইয়া ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার চেয়ারম্যান মাওলানা মাহমুদুল হাসান বলেন, নবীর শেষত্ব রক্ষা করা মুসলমানের রক্ত-মাংসে মিশে থাকা দায়িত্ব। তাই এই মহাসম্মেলন কেবল একটি দাবি নয়, বরং একটি ঈমানী দায়িত্বের বহিঃপ্রকাশ।
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেক তার বক্তব্যে খতমে নবুওয়তের আকিদাকে মুসলমানদের ঈমানের অপরিহার্য অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যেকোনো প্রকার ভ্রান্ত মতবাদ বা অপপ্রচার মুসলিম সমাজকে বিভক্ত করে। তাই এটি প্রতিরোধে সচেতনতা ও ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। বক্তারা দেশের শান্তি-স্থিতিশীলতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং মুসলিম একতার গুরুত্বও তুলে ধরেন।
মহাসম্মেলনকে ঘিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। মঞ্চের সামনে বসা হাজারো মানুষ মনোযোগ দিয়ে আলেমদের বক্তব্য শুনছিলেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের মধ্যে ছিল নিবেদন, আগ্রহ এবং তাদের বিশ্বাসের দাবিকে উচ্চকণ্ঠে প্রকাশের উচ্ছ্বাস। অনেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এসেছেন, কেউ এসেছেন গাড়িভর্তি মাদ্রাসাছাত্র নিয়ে। দুপুরের দিকে অংশগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে, যা আয়োজকদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায়। রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মিছিল-শ্লোগানে মুখর হয়ে দলবদ্ধভাবে মানুষ আসতে থাকায় উদ্যান ও আশপাশের এলাকা হয়ে ওঠে জনস্রোতের সমুদ্র।
মহাসম্মেলনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতিও নজর কাড়ে। ভিড় সামাল দিতে পুলিশ, র্যাব ও স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতা ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে সমাবেশজুড়ে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। বরং সবকিছুই ছিল সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ ও ধর্মীয় আবেগে উজ্জীবিত।
আয়োজকরা বলেছেন, এই সম্মেলনের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি শত্রুতা নয়, বরং খতমে নবুওয়তের অপরিবর্তনীয় আকিদা রক্ষা করা এবং মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য জোরদার করা। তারা জানান, ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে কোনো অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না হয় সে বিষয়েও সকলকে সচেতন থাকতে বলা হয়েছে।
দুপুর গড়ালে মঞ্চে বক্তাদের উপস্থিতি আরও ঘন হতে থাকে এবং অংশগ্রহণকারীরাও মনোযোগ দিয়ে বক্তব্য শোনেন। অনেকে জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা এসেছেন কেবল একটি ঈমানী দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। তাদের ভাষায়, এই সম্মেলন শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি মুসলমানদের চেতনা, ঐক্য এবং বিশ্বাসের প্রতীক।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলন দিনভর চলে এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের অংশগ্রহণে এটি পরিণত হয় দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশে। ইসলামী বিশ্বে মুসলমানদের বিশ্বাস ও আকিদা রক্ষার সংগ্রামে এই মহাসম্মেলন নতুন করে গুরুত্ব আরোপ করল বলেই মনে করছেন অনেকে।