প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গাজা উপত্যকার উত্তরের বেইত হানুন এলাকায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর স্থল অভিযানের সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণে পাঁচ সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। রাস্তার পাশে পুঁতে রাখা শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন। ইসরায়েলি দৈনিক টাইমস অব ইসরায়েল এই সংবাদ প্রকাশ করেছে।
ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) জানায়, সোমবার রাত ১০টার কিছু পর ঘটনাটি ঘটে, যখন পদাতিক সেনারা পায়ে হেঁটে বেইত হানুন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছিল। বোমা বিস্ফোরণের সময় তারা কোনো যানবাহনে ছিলেন না, বরং স্থলপথে একাধিক ইউনিট মিলে অভিযান চালাচ্ছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অভিযানের ঠিক আগ মুহূর্তে বিমান বাহিনীর মাধ্যমে ওই এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, কিন্তু সড়কের পাশে থাকা বিস্ফোরকটি হয়ত নজর এড়িয়ে যায়।
নিহত পাঁচ সেনার পরিচয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছে আইডিএফ। তারা হলেন জেরুজালেমের ২০ বছর বয়সী স্টাফ সার্জেন্ট মেইর শিমন আমার, সার্জেন্ট মোশে নিসিম ফ্রেচ, গাজা ডিভিশনের নর্দার্ন ব্রিগেডের অধীনে থাকা ২৮ বছর বয়সী সার্জেন্ট বেনিয়ামিন আসুলিন, নেটজাহ ইয়েহুদা ব্যাটালিয়নের ২০ বছর বয়সী স্টাফ সার্জেন্ট নোয়াম আহরন মুসগাদিয়া এবং একই ব্যাটালিয়নের ২১ বছর বয়সী স্টাফ সার্জেন্ট মোশে শমুয়েল নোল। নিহতদের বেশিরভাগই কেফির ব্রিগেডের সদস্য ছিলেন এবং তারা গাজার উত্তরে সংঘটিত অভিযান পরিচালনার সময় সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিচ্ছিলেন।
আইডিএফ সূত্রে জানা যায়, বেইত হানুনে ৬৪৬তম রিজার্ভ প্যারাট্রুপার্স ব্রিগেড এবং নেটজাহ ইয়েহুদা ইউনিট একযোগে উত্তর গাজা ব্রিগেডের অধীনে অভিযান পরিচালনা করছিল। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলটি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জিং যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত, যেখানে হামাস এবং অন্যান্য প্রতিরোধ গোষ্ঠীর শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। এলাকাটি বারবার ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্য হলেও পাল্টা প্রতিরোধ এবং সশস্ত্র ফাঁদ সেখানে অব্যাহতভাবে কাজ করছে।
এই ঘটনায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সেনা সদর দপ্তর থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল পর্যন্ত সবাই এই প্রাণহানিকে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে। সেনাবাহিনী বলছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে সামরিক হাসপাতালে।
সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা কেবল একটি অপারেশনাল ব্যর্থতা নয়, বরং গাজা যুদ্ধক্ষেত্রের জটিলতা এবং প্রতিপক্ষের কৌশলগত সক্ষমতাও তুলে ধরছে। বোমাটি যেভাবে রাস্তার পাশে স্থাপন করা হয়েছিল, তা অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং সামরিক অভিজ্ঞতার প্রমাণ বহন করে। এতে বোঝা যায়, গাজার ভেতরে থাকা প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলি কৌশল সম্পর্কে ভালোভাবেই অবহিত এবং তারা সেসব মাথায় রেখেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করছে।
এই ঘটনার পর গাজার উত্তরাঞ্চলে সেনা অভিযানের মাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে আইডিএফ। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি এবং আকাশ থেকে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিস্ফোরণের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, সেনাদের অবস্থান এবং অভিযানের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে নতুন করে অভিযানের কৌশল নির্ধারণ করার কথা জানিয়েছে সেনাবাহিনী।
গাজার উত্তরের যুদ্ধ পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। ইসরায়েলের স্থল অভিযান যত গভীরে প্রবেশ করছে, প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর ফাঁদ, বিস্ফোরক ও গেরিলা হামলার প্রবণতা তত বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও বাড়ছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনায় পাঁচ সেনার মৃত্যু কেবলমাত্র একটি সামরিক বিপর্যয় নয়, বরং পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটকেও নতুন করে উসকে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক মহল ইতোমধ্যেই ইসরায়েল-গাজা সংঘাতের নতুন এই দফা সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে এখনো পর্যন্ত কূটনৈতিক স্তরে কোনো কার্যকর শান্তিপ্রচেষ্টা দৃশ্যমান নয়। অপরদিকে, ইসরায়েল তার সামরিক অবস্থান আরও কঠোর করে তুলছে এবং গাজার প্রতিরোধ শিবিরগুলোকে নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে।
গাজা সীমান্তজুড়ে এই অস্থিরতা, সহিংসতা ও প্রাণহানি অব্যাহত থাকলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই তা বড় পরিসরে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—সহিংসতা বন্ধে আন্তঃজাতিক হস্তক্ষেপ এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, যার মাধ্যমে এই মৃত্যুমিছিলের অবসান ঘটানো যেতে পারে।