প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট ও ট্রাইব্যুনাল এলাকায় অতি–উচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভোর থেকেই সেনা ও বিজিবি সদস্যদের সশস্ত্র উপস্থিতি পুরো এলাকায় এক ধরনের সতর্ক বার্তা ছড়িয়ে দেয়। যেন আদালত চত্বরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অঘোষিত নিরাপত্তা বলয়, যার ভেতরে প্রবেশের প্রতিটি ধাপই এখন পরীক্ষিত ও অনুমোদনসাপেক্ষ।
ভোরের আলো উদয় হওয়ার আগেই ট্রাইব্যুনাল এলাকার প্রধান প্রবেশপথে সেনা সদস্যদের অবস্থান দৃশ্যমান হয়। এরপর ধীরে ধীরে আশপাশের পথ, সুপ্রিম কোর্টের প্রবেশদ্বার এবং সংলগ্ন সড়কগুলোতে বিজিবির টহল শুরু হয়। সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নয়; এর আগে গত বৃহস্পতিবারও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে সেনাবাহিনীকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। সেই সময়ও রায়ের দিন সামনে রেখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার নিরাপত্তা আরও কঠোর করা হয়েছে।
সেনা মোতায়েনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। আদালত প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “রায় ঘোষণার দিন যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন দেখা দেয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে জানানো হয়েছে এবং তারা দ্রুত দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে।” আদালতের আশপাশের এলাকা আজ যেন নিয়মিত আদালত চত্বর নয়, বরং একটি সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় স্থাপনা — যেখানে প্রতিটি যাতায়াত, প্রতিটি মুখমণ্ডল, এমনকি প্রতিটি ব্যাগও নজরদারির বাইরে নয়।
এই মামলার রায় ঘোষণা করবেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পাশাপাশি রয়েছেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এর আগে গত বৃহস্পতিবার ওই বেঞ্চই রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। আজকের রায় শুধুই একটি মামলার পরিণতি নয়; এটি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি প্রভাবশালী মুহূর্ত হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে।
প্রথমে তদন্ত ও পরে প্রসিকিউশন মামলাটি দাঁড় করিয়েছে পাঁচটি গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা কাঠামোগত উসকানিমূলক বক্তব্য দেন, যা পরবর্তী সহিংসতা উসকে দেয়। অভিযোগ রয়েছে যে তিনি হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূলের নির্দেশ দেন। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা, রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাগুলোও মামলায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবিতে এসব ঘটনা ছিল সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ। রায় ঘোষণাকে ঘিরে জনমনে দোলা দিচ্ছে নানা প্রশ্ন। অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে পলাতক। তার সঙ্গে মামলার আরেক আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও দেশত্যাগ করে আড়ালে। আদালতে আজ উপস্থিত থাকার কথা কেবল একজন ব্যক্তির—সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, যিনি মামলার একমাত্র গ্রেফতারকৃত আসামি।
গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠনের দিন মামুন স্বীকার করেন যে তিনি গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার সেই আকস্মিক স্বীকারোক্তি এবং রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন পুরো বিচারপরিবেশকে মুহূর্তেই আরও জটিল করে তোলে। আদালত তার আবেদন গ্রহণ করে, তবে শর্ত দেয় তিনি যদি সত্যনিষ্ঠভাবে ঘটনার বর্ণনা দেন এবং বিচারের ন্যায্যতার স্বার্থ রক্ষা করেন, তবে তার প্রতি বিশেষ বিবেচনা দেখানো হতে পারে। তার এই অবস্থান অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনেকে মনে করেন, মামুনের বিবৃতি আজকের রায়ের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ট্রাইব্যুনালের আশপাশে আজ মানুষের উপস্থিতি কম হলেও উদ্বেগের অভাব নেই। প্রতিটি সংবাদমাধ্যম, প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের চোখ এখন আদালতের দিকে। অনেকে মনে করছেন রায় ঘোষণার পর দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন উত্তেজনা ও সহিংসতা বাড়তে পারে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, দেশের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে স্পষ্ট হয় যে তারা রায়ের অপেক্ষায় অনিশ্চয়তা আর আশা—দুটি অনুভূতিই একসাথে বহন করছে। একজন দোকানদার বলেন, “দেশে শান্তি চাই। রায় যাই হোক, যেন অশান্তি না বাড়ে।” অন্যদিকে এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা ন্যায়ের বিচার চাই। যারা দোষী, তাদের শাস্তি হোক। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিচার যেন না হয়।”
রাজধানীর অনেক এলাকায় যান চলাচলে কড়াকড়ি দেখা গেছে। বেশ কিছু সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে, এবং আদালত এলাকায় প্রবেশের আগে সাধারণ নাগরিকদের একাধিক চেকপোস্ট অতিক্রম করতে হচ্ছে। সাংবাদিকদেরও বিশেষ পাস ছাড়া প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। আদালত ঘিরে থাকা নীরবতা, জমাটবদ্ধ পরিবেশ এবং ভোর থেকে চলা টহল—সব মিলিয়ে রায়ের গুরুত্ব আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
আজকের দিনটি তাই শুধু একটি আদালতের সিদ্ধান্ত ঘিরে নয়; দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রায়ের মধ্য দিয়ে আদালত যে বার্তা দেবে, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলায় দীর্ঘ প্রভাব ফেলবে। সমাজের সামগ্রিক প্রত্যাশা একটাই—ন্যায়ের স্বচ্ছ প্রতিফলন। সেই বাস্তবতা কতটা পূরণ হবে, তা জানতে আর কিছু সময়ের অপেক্ষা।